ডিসির বাসভবনে হরিজন সম্প্রদায়ের চাকুরি প্রত্যাশী নারীর আত্নহত্যা চেষ্টা

নওগাঁয় জেলা প্রশাসকের সরকারি বাসভবনে (বাংলো) পরিচ্ছন্নতাকর্মী পদে চাকুরী প্রত্যাশী হরিজন সম্প্রদায়ের এক নারী বিষপানে আত্মহত্যার চেষ্টা করেছেন।
রোববার বেলা ১১টায় শহরের কাচারী রোডে জেলা প্রশাসকের সরকারি বাসভবনে ঘটনাটি ঘটে। দীর্ঘ ১৫ বছর যাবৎ অস্থায়ী পরিচ্ছন্ন কর্মী হিসেবে ডিসির বাসভবনে কাজ করছেন ওই নারী। বিষ পানের পর ডিসির বাংলোর কর্মচারীরা তাকে উদ্ধার করে নওগাঁ জেনারেল হাসপাতালে নিয়ে যান। বর্তমানে রত্না হাসপাতালের মহিলা সার্জারি ওয়ার্ডে চিকিৎসাধীন আছেন।
রত্নার পরিবার সূত্রে জানা গেছে, রত্না রাণী গত ১৫বছর যাবৎ জেলা প্রশাসকের সরকারি বাসভবনে (বাংলো) ৩ হাজার টাকা বেতনে অস্থায়ী পরিচ্ছন্নতাকর্মী হিসেবে কাজ করে আসছেন। দীর্ঘদিন কাজ করায় একের পর এক জেলা প্রশাসককে কাছে থেকে দেখেছেন রত্না।
বর্তমান জেলা প্রশাসক হারুন অর রশিদও তাকে চেনেন। চলতি বছরের আগস্ট মাসের ৫ তারিখে জেলা প্রশাসক হারুন অর রশিদ স্বাক্ষরিত এক বিজ্ঞপ্তিতে মোট ৬টি পদে ৭৬জন কর্মচারি নিয়োগে বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করা হয়। এর মধ্যে ২০জন পরিচ্ছন্নতা কর্মীর পদ রয়েছে।
গত শুক্রবার (৫ নভেম্বর) জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে নিয়োগ পরিক্ষা অনুষ্ঠিত হয়। যেখানে অন্যান্য চাকুরী প্রত্যাশীদের মতো রত্না রাণীও পরিচ্ছন্নতাকর্মী পদে পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করে। গত শনিবার (০৬ নভেম্বর) পরীক্ষার উত্তীর্ণদের তালিকা প্রকাশ করা হয়।
তালিকায় রত্না রাণীর রোল না থাকায় হতাশ হয়ে পড়েন তিনি। রবিবার সকালে প্রতিদিনের ন্যায় ডিসির বাংলোতে পরিচ্ছন্নতার কাজে যাওয়ার আগে ইদুর নিধনের বিষাক্ত পাউডার সাথে নিয়ে যান রত্না।
সকাল সাড়ে ৬টা থেকে বেলা ১১টা পর্যন্ত কাজ করার পর জেলা প্রশাসকের কক্ষের একটি টয়লেটে প্রবেশ করে দরজা ভেতর থেকে বন্ধ করে ইদুর নিধন এর পাউডার খান রত্না। এরপর বিষয়টি বাংলোর কর্মচারীরা জানতে পারলে তার ছেলেকে খবর দেয়া হয়। ছেলে আসার পরও দরজা না খোলায় সবাই মিলে দরজা ভেঙ্গে তাকে উদ্ধার করে হাসপালে ভর্তি করেন।
রত্না রাণীর বড় বোন চম্পা রাণী বলেন, আমার বোন দীর্ঘ ১৫ বছর ধরে যেসব জেলা প্রশাসক এসেছেন চাকুরি সরকারীকরনের জন্য তাদের হাত-পা ধরে অনেক অনুরোধ করেছে। কিন্তু এত বছর কাজ করার পরেও একটি চাকুরি হলোনা। আমরা হরিজন সম্প্রদায়ের মানুষ আমরাই তো পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতার কাজ করে থাকি। তাহলে কেন আমাদের সম্প্রদায়ের মানুষদের চাকুরি হচ্ছেনা। আমাদের এই চাকুরি অবৈধভাবে টাকা নিয়ে বাঙালীদের দেয়া হচ্ছে।
রত্না রাণী বলেন, ডিসির বাসভবনে অনেক বছর ধরে মাত্র ৩ হাজার টাকায় কাজ করছি। এটা দিয়ে পরিবার চালানো অনেক কষ্টকর হয়ে যাচ্ছে। এবার নিয়োগে আমার চাকুরি স্থায়ীকরনের জন্য পরীক্ষার আগে স্যারের হাতে পায়ে ধরে অনেক অনুরোধ করেছিলাম।
আমাকে এই চাকুরি দেয়া হবে বলে স্যার আমাকে আশ্বস্ত করেছিলেন। কিন্তু রেজাল্ট আসার পর দেখলাম আমি পাশ করতে পারিনি। তাই রাতেই গলায় ফাঁস দিয়ে আত্মহত্যা করতে চেয়েছিলাম। এই চাকুরী না পেলে বাঁচার ইচ্ছা আমার নাই। এজন্য স্যারের রুমের টয়লেটে ঢুকে বিষপান করেছি। মরে গেলে হয়তো স্যার বুঝতেন চাকুরীটা আমার কত প্রয়োজন।
২৫০ শয্যা নওগাঁ জেনারেল হাসপাতালের জরুরি বিভাগের মেডিকেল অফিসার রুমা বিনতে রহমান জানান, রত্নাকে দুপুর ১২টার দিকে হাসপাতালে নিয়ে আসার পর তাৎক্ষণিক তাকে চিকিৎসা দেয়া হয়েছে। বর্তমানে তিনি কিছুটা সুস্থ আছেন। তবে ২৪ ঘন্টা যাবার আগে তাকে শঙ্কামুক্ত বলা যাচ্ছে না। সুস্থ্য হতে কমপক্ষে তাকে হাসপাতালে ২-৩দিন চিকিৎসা নিতে হবে।
এ বিষয়ে নওগাঁর জেলা প্রশাসক হারুন অর রশিদ বলেন, আমার বাসভবনে দীর্ঘদিন ওই নারী পরিচ্ছন্নতাকর্মী হিসেবে কাজ করতেন। উনি নিয়োগ পরীক্ষায় অংশ নিয়ে অকৃতকার্য হয়েছেন। এখানে স্বচ্ছতার সাথে নিয়োগ প্রক্রিয়া সম্পন্ন হচ্ছে। সরকারের নীতিমালা ভঙ্গ করে অকৃতকার্য কাউকে চাকুরী দেয়া সম্ভব নয়। তাকে চাকুরী দিতে কোন মিথ্যা আশ্বাস দেয়া হয়নি। ওই নারী আমার বাসভবনে এসে কেনো বিষপান করলেন বিষয়টি আমার জানা নেই।
আরপি/ এমএএইচ-১১
আপনার মূল্যবান মতামত দিন: