রাজশাহী সোমবার, ২৩শে নভেম্বর ২০২০, ১০ই অগ্রহায়ণ ১৪২৭

বাঘা

‘রঙিন মাছ’ চাষে রঙিন হচ্ছেন ফয়সাল


প্রকাশিত:
২১ নভেম্বর ২০২০ ২২:৩৫

আপডেট:
২৩ নভেম্বর ২০২০ ২১:৫২

উদ্যোক্তা ওয়াসেক ফয়সাল

বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ুয়া শিক্ষার্থী ওয়াসেক ফয়সাল। দেড় বছর ধরে ‘রঙিন মাছ’ চাষ করছেন। এই মাছ চাষ করেই রঙিন হচ্ছেন তিনি। স্বপ্ন দেখেছেন বড় একটি খামার করার।

শুক্রবার সকালে তার বাড়িতে গেলে দেখা যায়, তরুণ উদ্যোক্তা ওয়াসেক ফয়সালের বাড়ির আঙ্গিনায় ছোট ছোট প্লাস্টিক, মাটির পাত্র, ইট দিয়ে তৈরি চৌবাচ্চায় রাখা পানিতে ভাসছে নানা রঙের রঙিন মাছ। এরমধ্যে লাল, নীল, কমলা, কালো, বাদামি, হলুদ রঙের মাছের ছড়াছড়ি। গোল্ড ফিশ, গাপ্পি, বিভিন্ন রঙের চিংড়ি, রেড ক্যাপ, মলি, বেলুন মলি এছাড়াও অনেক ধরনের মাছ। এই মাছ দেখলে যেমন চোখ জুড়ায়, তেমন মন ভরে যায়। বাড়ির প্লাস্টিকের ছোট ছোট গ্লাসে ও অ্যাকুরিয়ামে শোভা পাচ্ছে এসব রঙিন মাছ। এই রঙিন মাছের চাষ তার জীবনকে রাঙিয়ে দেবে বলে তার বিশ্বাস। এই মাছ চাষের মাধ্যমে তিনি নিজের পাশাপাশি ছোট বোন তুরিনের পড়ালেখার খরচ জোগাচ্ছেন। ফলে বাবাকে আর কষ্ট করে সন্তানদের পড়ার খরচ জোগাতে হচ্ছে না।

ওয়াসেক ফয়সাল জগনাথ বিশ্ববিদ্যালয়ে কম্পিউটার সায়েন্স এন্ড ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের এমএসসির ছাত্র। বোন তুরিন বাঘা রহমতউল্লা বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ের অষ্টম শ্রেণিতে পড়ে। ফয়সাল রাজশাহীর বাঘা উপজেলার গাওপাড়া গ্রামের তসিকুল ইসলামের ছেলে।

ফয়সাল জানান, ২০১৯ সালের এপ্রিল মাস থেকে বাড়ির আঙিনায় ছোট্ট পরিসরে গড়ে তোলেন একটি ফিশ ফার্ম। পোনা কেনা, খাবার দেয়াসহ নানা কাজে তাঁর প্রথমে খরচ হয়েছিল ৪ হাজার টাকা। বছর ঘুরতেই মাছ বিক্রি করেছেন প্রায় ৮০ হাজার টাকার। ইতোমধ্যেই ব্যবসা আরেকটু সম্প্রসারিত করেছেন। এই ব্যবসার সাথে যুক্ত হয়েছে রঙ্গিন মাছে ব্যবহৃত শোভাবর্ধনকারী বিভিন্ন প্রকার পানির নিচে থাকা গাছ। এই গাছের মধ্যে রয়েছে অক্টোপাস, কোবাম্বা, এম্বুলিয়া, ষ্টারপ্র্যাস, ফগবিট, ডেন্সাসহ আরো ৯০ রকমের গাছ। এই গাছ একটি ডোগা বিক্রি হয় ৫ টাকা থেকে ২০০০ টাকা পর্যন্ত। এতেও পেয়েছেন সফলতা।

তিনি জানান, অ্যাকুরিয়ামের দোকানে রঙিন মাছ দেখে ভীষণ ভালো লাগে তার। কৌতূহলী হয়ে মাছের দাম জানতে চান। জানতে পারেন মাছগুলো বেশ দামি।
রঙিন মাছগুলো বিদেশ থেকে আনা হয়। বর্তমানে দেশে এই মাছের চাষ হচ্ছে। সেখান থেকেই রঙিন মাছ চাষের পরিকল্পনা মাথায় আসে তার।
বছরের শুরুতে মাটির তৈরি চারিতে অল্প কয়েকটি রঙিন মাছ ছাড়েন ওয়াসেক ফয়সাল। দুই মাসের মধ্যে মাছগুলো বেশ বড় হয়ে যায়। রঙিন মাছগুলো বড় হওয়ার পর তাঁর উৎসাহ বেড়ে যায়। তখন আরও বিভিন্ন প্রজাতির মা মাছ সংগ্রহ করেন দেশের বিভিন্ন জায়গা থেকে। এই মাছ বড় করতে তাঁকে আরও ৫টি চৌবাচ্চা তৈরি করতে হয়।
২০১৯ সালের এপ্রিল মাসে ছয়টি চৌবাচ্চায় রেণু ছাড়া হয়। অধিকাংশ চৌবাচ্চা ৪ ফুট দৈর্ঘ্য ও ৩ ফুট প্রস্থের। এরপর মাছগুলো বড় হতে থাকে। এক পর্যায়ে ডিম দেয়। ডিম থেকে রেণুপোনা উৎপাদিত হয়, যা বাজারে বিক্রি করেন। যারা অ্যাকুরিয়াম ব্যবসা করেন, তারা অনেকেই এখন তার থেকে এই মাছ ক্রয় করেন।

উদ্যোক্তা ফয়সাল আরো জানান, চলতি মাসের শুরুতে তিনি ছয়টি চৌবাচ্চার পাশাপাশি আরও কিছু নতুন চৌবাচ্চা তৈরী করে মাছের চাষ করছেন। যেখানে তিনি দেড় শতাধিক মা মাছ আর অর্ধশতাধিক পুরুষ মাছ ছেড়েছেন। তিন থেকে চার মাসের মধ্যে এগুলো বড় হবে। তখন চৌবাচ্চায় দিয়ে ডিম ফোটাবেন। তারপর রেণু বিক্রি করবেন। তিনি আশা করছেন, এবার দেড় থেকে দুই লাখ টাকার রঙিন মাছ বিক্রি করতে পারবেন।

বর্তমানে খামারে গোল্ড ফিশ, কমেট, কই কার্ভ, ওরেন্টা গোল্ড, সিল্কি কই, মলি, গাপ্পি, রঙিন চিংড়ি, প্লাটিসহ ২০ প্রজাতির মা মাছ রয়েছে। একটি মাছ বছরে প্রায় এক হাজার রেণু–পোনা দেবে। ৩ থেকে ৪ ইঞ্চি বড় হলে এই মাছ বিক্রি করা যাবে।

ফয়সালে মা ফরিদা বেগম বলেন, শুরুতে এলাকার মানুষসহ অনেক বন্ধুরাও এই চাষ দেখে হাসাহাসি করতেন এবং বিভিন্নভাবে মজা করতেন। সবাই মনে করতেন এটা আমার খেয়ালিপনা। কিন্তু হাল ছাড়িনি। এখন এলাকার মানুষ ছাড়াও মৎস্য কর্মকর্তারা এই মাছ দেখতে আসছেন। অনেকে খামার দেখতে এসে মাছ কিনে নিয়ে যাচ্ছেন। 

একটি নিজস্ব ফেইসবুক পেইজ এবং ওয়েবসাইট আছে তার; যার মাধ্যমে এই ব্যবসাকে সম্প্রসারিত করেছেন ফয়সাল।

ফয়সাল শুধু রঙ্গিন মাছ চাষেই সীমাবদ্ধ থাকেননি। তার বাড়ির আঙ্গিনাতে পরিবারের সহায়তায় গরু পালন, হাস, দেশি মুরগি, কক মুরগি, দেশি-বিদেশি কবুতর, ছাগল এমনকি কচ্ছপ পালন শুরু করেছেন। পাশাপাশি টিয়া পাখিও পালন করছেন। কবুতরের মধ্যে রয়েছে লক্ষা, ময়ুরী, সিরাজি, হুমার, ডাউক, লোটন, বম্বায়, শটফেজ, ঢাকায় গিরিবাজ। প্রতিটির জন্য আলাদা সেট ঘর তৈরী করা হয়েছে। পরিচর্চার জন্য আলাদা কোন লোক নেই। ফয়সাল যখন থাকেন না, তখন তার ছোট বোন তুরিন এগুলোর পরিচর্চা করেন। পাশাপাশি মা বাবা সহযোগিতা করেন।

এ বিষয়ে উপজেলা ভারপ্রাপ্ত মৎস্য কর্মকর্তা আমিরুল ইসলাম বলেন, এটি একটি ভালো উদ্যোগ। এই মাছ চাষে সরকারিভাবে প্রশিক্ষণ ও সহজ ঋণের ব্যবস্থা থাকলে আরো ভালো করতে পারতেন ফয়সাল। সঠিক পরিচর্চা থাকলে এই খামার জীবনকে বদলে দেবে ফয়সালের। আমি তার রঙিন মাছের চাষ দেখেছি। ব্যতিক্রমী উদ্যোগ ভালো লেগেছে।

 

 

আরপি/এসকে




আপনার মূল্যবান মতামত দিন:

Top