রাজশাহী রবিবার, ১১ই জানুয়ারী ২০২৬, ২৮শে পৌষ ১৪৩২

পদ্মায় হারালো রুমনের একদিনের সংসার


প্রকাশিত:
১৫ মার্চ ২০২০ ০৬:০০

আপডেট:
১১ জানুয়ারী ২০২৬ ০৫:৩৫

৬ মার্চ সন্ধ্যার দিকে নিউজ ডেস্কে বসেছিলাম। হঠাৎ কলিগ বললো, ‘আজ পদ্মায় ৪০ জন যাত্রীসহ ২টি নৌকাডুবির ঘটনা ঘটেছে। আমরা লাইভে যাচ্ছি। আপনি নিউজগুলো একটু দেখেন।’
-ঠিক আছে।

রাত ৯টার কাছাকাছি সময়ে অফিসিয়াল মেসেঞ্জার গ্রুপে একটা ছবি আসলো। বর-বধুর পাশাপাশি বসা ছবি। বরকে দেখে খুব চেনা মনে হলো। একটু ভালো করে দেখতেই চিনতে পারলাম। আসাদুজ্জামান রুমন। ইন্টারমেডিয়েটে আমার ক্লাসমেট ছিল। সেই হিসেবে বয়স ২৩-২৪ হবে। পদ্মার ওপারে চর খিদিরপুর এলাকায় বাড়ি।

বুঝতে আর বাকি রইলো না দুর্ঘটনার শিকার হয়েছে আমার সদ্য বিবাহিত বন্ধু। কিছুক্ষনের মধ্যে নিউজটাও চলে এলো। জানতে পারলাম, নববধু-সহ ৪০ জন যাত্রী নিয়ে দুইটি নৌকায় বন্ধু রুমন শ^শুর বাড়ি যাচ্ছিলেন। যাত্রা পথে সন্ধ্যা ৭টার দিকে শ্রীরামপুর এলাকায় নদীতে দুর্ঘটনার কবলে পড়ে তারা। রাজশাহী সদর ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স’র মাধ্যমে জানতে পারলাম রুমন-সহ বেশির ভাগ আরোহীকে উদ্ধার করা সম্ভব হয়েছে। কিন্তু তখনও নববধূ সুইটি-সহ অনেকেই নিখোঁজ।

পরের দিন ঘটনাস্থলে গেলাম। উদ্ধারকাজ চলছে। অনেককেই উদ্ধার করা হয়েছে। তবে নববধূ সুইটি তখনও নিখোঁজ। বন্ধু রুমনের সাথেও দেখা হলো। সান্তনা দেয়ার ভাষা ছিল না। সদ্যই যার সাথে আজীবন পথচলার শপথ নিয়েছিল, সেই প্রিয়তমা স্ত্রী সুইটির জন্য পদ্মাপাড়ে অপেক্ষায় ছিল রুমন। কি বলব? কিভাবে সান্তনা দেব। ওর রুক্ষ, শুষ্ক মুখের দিকে তাকিয়ে নির্বাক হয়ে গেলাম।

একে একে লাশ নিয়ে আসছেন উদ্ধারকর্মীরা। আর অপেক্ষার প্রহর দীর্ঘ হচ্ছে রুমনের। কখন দেখতে পাবে তার স্ত্রীকে। প্রতীক্ষা যেন আর শেষ হয়না। দিন গেল, রাত পৌহালো, এভাবে আরও একটি দিন গড়িয়ে নিয়মে ভোর হলো। তিন দিন পরে নববধূর সাজেই ফিরল স্ত্রী সুইটি। লাল বেনারসী, গহনা সবই ছিল, শুধু ছিল না প্রাণপাখি।

কালেমার বাঁধনে আবদ্ধ প্রিয়তমার লাশ দেখার পরে রুমনের আহাজারী থামানো সম্ভব হলো না।

“ওমা... আমি এ কি দেখলাম!” রুমনের চিৎকারে যেন সকল মানুষ নিঃস্তব্ধ হয়ে গেছে। সকলেই নিরবতা পালন করার মত চুপ হয়ে গেল। ওর গগনবিদারী আর্তনাদে প্রকৃতিতে নেমে এলো শোকের মাতম।

সুইটির লাশ পাওয়ার আগে রুমনের সাথে একবার কথা হয়েছিল। সে বলছিলো, নৌকাডুবির পরই সে সাঁতরে তীরে ওঠে। স্ত্রীকে খুজেঁছেন অনেক, কিন্তু পাননি। যাদেরকে পেরেছেন তুলেছেন। তখনো অনেকেই নিখোঁজ ছিল।

নৌকাডুবির মধ্য দিয়ে শেষ হলো রুবনের একদিনের সংসার। হাজারো স্বপ্নে রাঙানো ভবিষ্যত জীবন পরিকল্পনার ইতি ঘটলো জীবন সঙ্গির বিদায়ে। আর শুরুতেই শেষ হয়ে যাওয়া একটি ভালোবাসার গল্পের সাক্ষী হলাম আমি।

 

আরপি/এমএএইচ



আপনার মূল্যবান মতামত দিন:

Top