রাজশাহী বৃহঃস্পতিবার, ৬ই আগস্ট ২০২০, ২৩শে শ্রাবণ ১৪২৭

রাজস্ব হারাবে সরকার

নাচোলে পুকুর লিজ না পাওয়ায় ১২টি মৎস্যজীবি সমিতির বিরুদ্ধে মামলা


প্রকাশিত:
৩১ জুলাই ২০২০ ১৯:৩২

আপডেট:
৬ আগস্ট ২০২০ ১৬:২৯

চাঁপাইনবাবগঞ্জের নাচোলে জলমহল ব্যবস্থপনা কমিটির ইজারায় পুকুর লিজ না পাওয়ায় ১২টি মৎস্যজীবি সমবায় সমিতির বিরুদ্ধে মামলা করেছে নাচোল উপজেলার মোহাম্মদপুর চৌকি মৎস্যজীবি সমবায় সমিতির সভাপতি ও হামিদপুর গ্রামের আব্দুল করিমের ছেলে আকবর আকবর আলী। পুকুর লীজ না পাওয়ায় আকবর আলী একই সাথে আদালতে অস্থায়ী নিষেধাজ্ঞা চেয়ে মামলা ও দ্বায়ের করেছে।
 
আকবর আলীর এমন মিথ্যা মামলা দায়ের করায় নাচোল উপজেলার প্রকৃত মৎস্যজীবি সমবায় সমিতির সদস্যরা নানা উৎকন্ঠায় রয়েছে।
 
সংশ্লিষ্ট সূত্রে ও অনুসন্ধানে জানা গেছে, নাচোল উপজেলায় প্রচুর খাস পুকুর রয়েছে,কিন্তু কোন নদী নেই। যার ফলে প্রকৃত মৎস্যজীবি অতি নগণ্য। প্রকৃত মৎস্যজীবি ও মৎস্যজীবি সমিতি না থাকায় পাশের উপজেলার মৎস্যজীবি সমিতিগুলো এ উপজেলায় খুব সহজেই লিজ গ্রহন করে থাকে।
 
আর এ সুযোগে ২০১৯ সালে আকবর আলী তাঁর আপন ছোট ভাই নাচোল উপজেলা সমবায় অফিসের কম্পিউটার অপারেটর মোস্তাফিজুর রহমান এর যোগসাজসে তাঁর নামে এবং নিজের আত্মীয়স্বজনের নামে নিয়ম বর্হিভুত ভাবে ৪ টি মৎস্যজীবি সমবায় সমিতি রেজিস্ট্রেশন করে। রেজিস্ট্রেশন প্রাপ্ত সমিতি গুলো হলো:(১) বেনীপুর মৎস্যজীবি সমবায় সমিতি যার সভাপতি হলো আকবর আলীর ছোট ভাই মনির হোসেন (২) বিজলী পাড়া মৎস্যজীবি সমবায় সমিতি,যার সভাপতি হলো আকবর আলীর পিতা আব্দুল করিম (৩) কেন্দুয়া গাসুড়া মৎস্যজীবি সমিতি, যার সভাপতি হলো আকবর আলীর আপন চাচাতো ভাই (৪) কাতলা কান্দর মৎস্যজীবি সমবায় সমিতি,যার সভাপতি আলমগীর আলী আকবরের আত্মীয় এবং (৫) মোহাম্মদপুর চৌকি মৎস্যজীবি সমিতির সভাপতি হলো আকবর আলী নিজেই।
 
হামিদপুর থেকে মোহাম্মদপুর চৌকি এলাকার দুুুরুত্ব হচ্ছে প্রায় ২০কি.মি। অথচ নিয়ম বহির্ভূতভাবে আকবর আলীকে সভাপতি করা হয়েছে মোহাম্মদ পুর মৎস্যজীবি সমিতির। আর এই নতুন সমিতি রেজিস্ট্রেশন করার পর গত ১৯ সালের এপ্রিল মাসে স্থানীয় এলাকার লোকজন কে আগ্রাহ্য করে জলমহাল ইজারায় সদর ইউনিয়নের বেনীপুর মৌজার ৭৪১ দাগের ২.৫১ একর আয়তনের সরকারী পুকুরের বিপরিতে, আন্ধরাইল মৌজায় ৩৪ দাগের ১.৫৫ একরের পুকুরটিতে বেনীপুর মৎস্যজীবি সমবায় সমিতি,  মোহাম্মদপুর মৌজায় ৪৮০ দাগের ১.৮৬ একরের পুকুরটিতে মোহাম্মদপুর মৎস্যজীবি সমবায় সমিতি, অপরদিকে নেজামপুর ইউনিয়নের কেন্দুয়া মৌজায় ১.৮৮ একরের পুকুরটিতে কাতলাকান্দর মৎস্যজীবি সমবায় সমিতি টেন্ডার ড্রপ করে।
 
আকবর আলীর এমন কৌশল জানতে পেরে গতবছরের ১১ এপ্রিল বুধবার আকবর আলীর বিরুদ্ধে উপজেলা নির্বাহী অফিসার বরাবর লিখিত অভিযোগ করেন উপজেলার মোহাম্মদ পুর রাজবাড়ী গ্রামের বকুয়া কেরকাটার ছেলে সুবাস ক্যালকেটা।পরে বিভিন্ন এলাকার ভুক্তভোগিদের অভিযোগের প্রেক্ষিতে আকবর আলীর পুকুর সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে গত বছরের ৪ আগষ্ট রাতারাতি ভুয়া ৫টি মৎস্যজীবি সমিতির নিবন্ধন বাতিলের জন্য বাংলাদেশ সমবায় অধিদপ্তরের মহা পরিচালক বরাবর লিখিত অভিযোগ করেন নাচোল উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান আব্দুল কাদের।
 
সেই অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে ১৯/১০/১৯ইং বাংলাদেশ সমবায় অধিদপ্তর তদন্ত প্রতিবেদন দাখিলের জন্য রাজশাহী বিভাগীয় সমবায় অধিদপ্তর যুগ্ম পরিচালক কে নির্দেশ দেন।এই পাঁচটি সমিতির বিরুদ্ধে বিভিন্ন মহলে অভিযোগ হওয়ায় গত বছরের জলমহাল ব্যবস্থপনা ইজারা কমিটিতে ঐ পাঁচটি সমিতি কে পুকুর না দেওয়ার সিধান্ত গ্রহন করেন নাচোল জলমহাল ব্যবস্থপনা কমিটির সভাপতি উপজেলা নির্বাহী অফিসার।
 
গত বছরের জলমহাল ব্যবস্থপনা কমিটির ইজারায় কোন পুকুর না পেয়ে চলতি বছরের ২৮ জুলাই ২০২০ইং চাঁপাইনবাবগঞ্জ জজ আদালতে বিভিন্ন অজুহাত দেখিয়ে ১২টি মৎস্যজীবি সমবায় সমিতি ও নাচোল উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান এবং ইউএনওর বিরুদ্ধ  চলতি বছরে যাতে কোন ইজারা না প্রদান করা হয় সেই মর্মে মামলা দ্বায়ের করেন আকবর আলী।
 
আকবর আলীর দ্বায়েরকৃত মামলার ১২টি মৎস্যজীবি সমবায় সমিতি গুলো হলো (১) বাইপুর মৎস্যজীবি সমবায় সমিতি (২) সাহাপুর পূর্ব (৩) সালালপুর (৪) পরানপুর (৫) উত্তরচন্ডীপুর (৬) কাজী পাড়া বাইপুর (৭) দক্ষিন চাঁদপাড়া (৮)চন্দনা (৯) বিল বাউসি (১০) মেঘডহর (১১) ইসলামপুর ও (১২) ফুলবাড়ি মৎস্যজীবি সমবায় সমিতি।
 
আকবর আলীর মনগড়ানো মামলার পরিপ্রেক্ষিতে যদি ২০২০ সালের জলমহাল ইজারা স্থগিত করা হয় তাহলে সরকার নাচোল উপজেলা জলমহাল ইজারার প্রায় ২কোটি টাকা রাজস্ব হারাবে বলে মনে করছে মৎস্যজীবি সংগঠনের নেতারা।
 
এ বিষয়ে বাইপুর মৎস্যজীবি সমবায় সমিতির সভাপতি সাফিউল ইসলাম জানান,আকবর আলী নিজেই একজন দুষ্কৃতি প্রকৃতির লোক।সে  সিন্ডিকেট তৈরী করে জেলা থেকে বিভিন্ন সমিতি লক্ষ টাকা দিয়ে ক্রয় করে প্রতিবছর নাচোল উপজেলায় জলমহাল ইজারা টেন্ডার ড্রপ করে। আমাদের প্রকৃত মৎস্যজীবি সমিতির বিরুদ্ধে আকবর আলীর এমন মামলা দ্বায়েরের তীব্র প্রতিবাদ জানাচ্ছি। 
 
এ বিষয়ে চন্দনা মৎস্যজীবি সমিতির সভাপতি বজলুর রশিদ জানান,আকবর আলী পুকুর সিন্ডিকেটের মুল হোতো।অবৈধভাবে সমিতি করে পুকুর না পাওয়ায় সরকার কে রাজস্ব  থেকে বঞ্চিত করার লক্ষ্যে এমন মামলা করেছে।আমাদের কাছে উপজেলা চেয়ারম্যান কিংবা ভাইস চেয়ারম্যান কোন সমিতি ক্রয় করেনি। আকবর আলীর এমন মামলার বিরুদ্ধে তীব্র প্রতিবাদ জানাচ্ছি।
এ বিষয়ে  সালাল পুর মৎস্যজীবি সমিতির সভাপতি নজরুল ইসলাম জানান,আমার সমিতি বৈধ ভাবে ১৯৭৯সালে রেজিস্ট্রেশন প্রাপ্ত। আকবর আলী অহেতুক কারনে সরকার কে জলমহাল ইজারার রাজস্ব থেকে বঞ্চিত করার লক্ষ্যে মিথ্যা মামলা করেছে।আকবর তো নিজেই পুকুর চুরির সাথে জড়িত।মিথ্যা মামলার তীব্র প্রতিবাদ জানাচ্ছি।
 
এ বিষয়ে নাচোল উপজেলা নির্বাহী অফিসার সাবিহা সুলতানা বলেন, এখনো পুকুরগুলো হস্তান্তর করা হয়নি। তাই অভিযোগের কারনও বুঝতে পারছি না। এসময় সরকারি পুকুর ইজারা হয়ে হস্তান্তরের আগেই আকবর আলীর অভিযোগ করা নিয়েও প্রশ্ন তোলেন তিনি।
 
এ বিষয়ে নাচোল উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান ও উপজেলা আওয়ামীলীগের সাধারণ সম্পাদক আব্দুল কাদের বলেন,আকবর আলী একজন পুকুর চুরির সিন্ডিকেটের মুল হোতা।সে গত বছর নিয়মবহির্ভূত ভাবে নিজের নামে পাঁচটি সমিতি রেজিস্ট্রেশন করে। সেই সমিতি গুলোর বিরুদ্ধে বিভিন্ন মহলে অভিযোগ করেছে এলাকার লোকজন। বিভিন্ন মহলে অভিযোগ থাকায় সে পাঁচটি সমিতি কে গত বছর জলমহাল ব্যবস্থপনা কমিটির সভায় পুকুর লীজ না দেওয়ার সিদ্বান্ত গ্রহন করে জলমহাল ব্যবস্থপনা কমিটির সভাপতি ইউএনও।পুকুর লীজ দেওয়া এবং স্থগিত করার ক্ষমতা রাখে জলমহাল কমিটির সভাপতি ইউএনও।
পুকুর না পাওয়ায় মানুষ কে হয়রানি করতে মিথ্যা মামলা করেছে মৎস্যজীবি সংগঠন গুলোর বিরুদ্ধে। তীব্র প্রতিবাদ জানাচ্ছি। 
 
আরপি/আআ-০১



আপনার মূল্যবান মতামত দিন:

Top