রাজশাহী শনিবার, ২২শে জুন ২০২৪, ৯ই আষাঢ় ১৪৩১

মেম্বারের লাঠিয়াল বাহিনীর হাত থেকে নিস্তার নেই চেয়ারম্যানেরও!


প্রকাশিত:
৩ ফেব্রুয়ারি ২০২৩ ০৬:৪০

আপডেট:
৩ ফেব্রুয়ারি ২০২৩ ০৯:৫৩

ফাইল ছবি

রাজশাহীতে ইউনিয়ন পরিষদের (ইউপি) এক সদস্যের সন্ত্রাসী বাহিনীর দাপটে আতংকিত পুরো গ্রামবাসী। ওই লাঠিয়াল বাহিনীর তাণ্ডব থেকে রেহাই মিলছে না একই ইউপির চেয়ারম্যানেরও।

জেলার বাগমারা উপজেলার নরদাশ ইউনিয়নের ৪নং ওয়ার্ড সদস্য রফিকুল ইসলাম এমনই ত্রাসের সৃষ্টি করেছেন নরদাশ গ্রামজুড়ে। সম্প্রতি স্থানীয় হাতিয়ার বিলে মাছ চাষ কেন্দ্র করে এ বাহিনীর হামলায় অন্তত ১৫ কৃষক আহত হয়েছেন বলে গ্রামবাসীর অভিযোগ।

গতকাল বুধবার (১ ফেব্রুয়ারি) সকাল ১০টার দিকে এ হামলার ঘটনা ঘটে। একই দিনগত রাত ১২টা ৫ মিনিটে ২৫ জনের নাম উল্লেখপূর্বক অজ্ঞাত আরও ২০-২৫ জনকে আসামি করে থানায় একটি মামলা হয়েছে।

হামলায় আহতরা হলেন, উপজেলার নরদাশ এলাকার সৈয়দ আলীর ছেলে জোনাব আলী (৩৭), মোহাম্মদ আলীর ছেলে বাবু (২৮), মৃত বেলাল হোসেনের ছেলে সাকিম (৩০), মৃত আব্দুল মালেকের ছেলে আজাদ (২৭), ময়েজ হোসেনের ছেলে দুলাল (৩৬), মকবুল হোসেনের ছেলে দলিল হোসেন (৩৯), নজের আলীর ছেলে আব্দুর রশিদ (৪২) ও মমতাজ হোসেন (৪৭), ফজির উদ্দিনের ছেলে মোবারক (৩৫), ইবরাহিম হোসেনের ছেলে আবদুল মতিন (৩৪), ইয়ার উদ্দিনের ছেলে আব্দুল মান্নান (৩২) ও আব্দুল হান্নান (২৮), মৃত ইমানের ছেলে শহিদ হোসেন (৩৪), কাশেম সরদারের ছেলে ময়নুল (৩৮) ও ছলিম উদ্দিন (৪০)।

এ ঘটনায় দায়েরকৃত মামলায় আসামিরা হলেন, সোলাইমান আলীর ছেলে জোনাব আলী (৩৭), মৃত আব্বাস আলীর ছেলে আব্দুল মান্নান (৩৮), আবেদ আলী (৩৬), আব্দুস সামাদ (৪২) ও ভুট্টু মিয়া (২৬), রফাতুল্ল্যাগ সরকারের ছেলে সেকেন্দার আলী (৪৩), মৃত খোদা বক্সের ছেলে জাফের আলী (৪৩), শাখাওয়াত হোসেনের ছেলে জুলফিকার আলী বাচ্চু (৫০), বাচ্চুর ছেলে মো. মীম (২২), মৃত এনায়েত আলীর ছেলে আব্দুস সাত্তার (৫৪), মৃত এরশাদ আলীর ছেলে বেলাল হোসেন (৩৬), মৃত তছির উদ্দিনের ছেলে রেজাউল ইসলাম (৩৮), লোকমানের ছেলে কুদ্দুস আলী (৩৯), মৃদ ওসমানের ছেলে হারেজ আলী (৫৬) ও আবু বক্কর (৪২), রফিকুল ইসলামের ছেলে ফজলু (৩৬), মকছেদের ছেলে হাসান (২৭), মৃত আব্দুল কাদেরের ছেলে রাশেদুল ইসলাম ঝন্টু (৪৭), মৃত আশরাফ আলীর ছেলে সিরাজুল ইসলাম মনা (৩৮), মৃত জাবেদ আলীর ছেলে কুদ্দুস (৪৩), মৃত ফজের আলীর ছেলে মজিবর রহমান (৫৮), আফছারের ছেলে আফজাল হোসেন (৪৪), মৃত শরিয়ত উল্লাহর ছেলে আব্দুল মতিন (৪৬), মৃত মেজাতুল্লাহর ছেলে তমিজ উদ্দিন (৬৫), রহিম বক্সের ছেলে রফিক উদ্দিন (৫০)। তারা সবাই বাগমারার নরদাশ, হাট মাধনগর ও চন্ডিপুর এলাকার বাসিন্দা।

বৃহস্পতিবার (০২ ফেব্রুয়ারি) সরেজমিনে দেখা যায়, এ ঘটনার জেরে থমথমে অবস্থা বিরাজ করছে পুরো এলাকায়। আবারও প্রতিপক্ষের হামলার আশংকায় সবার কপালে চিন্তার ভাঁজ।

বিল সংলগ্ন জমির কৃষকরা জানান, হাতিয়ার বিলের প্রায় ২ হাজার ২০০ বিঘা জমিতে ১৪-১৫ বছর ধরে জোরপূর্বক মাছ চাষ করে আসছিল প্রভাবশালী একটি চক্র। এ চক্রের মূলহোতা ইউপি সদস্য রফিকুল ইসলাম। প্রায় ৮০০ কৃষকের জমি রয়েছে এ বিলে। বছরের বড় একটা সময় পানিভর্তি থাকায় সব সময় চাষাবাদেরও সুযোগ নেই তাদের।

তাদের অভিযোগ, বাহিনীটি কৃষকদের নায্যমূল্য দিতে অপারগতা প্রকাশ করে। এমনকি অস্ত্রের মহড়া দেখিয়ে প্রাণে মেরে ফেলার হুমকি-ধামকি দিতে থাকে প্রতিনিয়ত। এ ঘটনায় পুলিশের কাছে লিখিত অভিযোগ দিয়েও কোনো সুরাহা হয়নি। সবশেষ গত বুধবার সকালে মাছ চাষ নিয়ে কথা কাটাকাটির জেরে হাসুয়া ও লাঠিশোটা নিয়ে কৃষকদের ওপর হামলা চালায় সন্ত্রাসীরা।

গ্রামবাসীর দাবি, এ হামলার নির্দেশদাতা ইউপি সদস্য রফিকুল। এতে প্রায় ১৫-২০ জন আহত হন, যাদের দুইজন রাজশাহী মেডিকেল কলেজ (রামেক) হাসপাতালে গুরুতর আহত হয়ে চিকিৎসা নিচ্ছেন। একজন আশঙ্কাজনক অবস্থায় রয়েছেন হাসপাতালের আইসিইউতে। আর বাকিরা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে চিকিৎসা নিয়েছেন।

কৃষকদের অভিযোগ, ইউপি সদস্য রফিকুলের ১৫-২০ জনের একটি সন্ত্রাসী বাহিনী রয়েছে। মানুষের সম্পত্তি জবরদখলের জন্য তাদের ব্যবহার করে। এভাবে অবৈধ টাকায় চারতলা দৃষ্টিনন্দন বাসা-বাড়ি তৈরি করেছেন তিনি। অথচ মেম্বার হওয়ার আগে কিছুই ছিল না তার।

হামলার ব্যাপারে আহত কৃষক সাকিম বলেন, ‘আমরা মাঠে কাজ করছিলাম। আমরা কোনোকিছু বুঝে ওঠার আগেই কয়েকজন সন্ত্রাসী এসে কোপাতে শুরু করে।’

এ বিষয়ে মামলার বাদি কৃষক মজিবর রহমান বলেন, মতিন ও রফিকের নেতৃত্বে পরিকল্পিতভাবে এ হামলা চালানো হয়। হামলাকারীদের মদদদাতা স্থানীয় মেম্বার। বর্তমানে এলাকায় চরম উত্তেজনা বিরাজ করছে। সাধারণ কৃষকরাও আতঙ্কে রয়েছেন। এ ঘটনায় জমি উদ্ধারপূর্বক হামলাকারীদের গ্রেফতার ও শাস্তির দাবি জানিয়েছেন তিনি।

নরদাশ ইউপির চার বারের সাবেক চেয়ারম্যান মুসলেম উদ্দিন বলেন, বিলে আমারও জমি রয়েছে। প্রভাবশালীরা কোনো টাকাপয়সা ছাড়াই আজীবন ভোগদখল করে খেতে চায়। নায্যমূল্য চাওয়ায় কৃষকদের ওপর হামলা চালানো হয়েছে।

এ ব্যাপারে বাগমারা উপজেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ও নরদাশ ইউপির বর্তমান চেয়ারম্যান অধ্যক্ষ গোলাম সারওয়ার আবুল বলেন, ওই বিলে আমাদেরও ১০/১২ বিঘা জমি আছে। যেখানে ১২ মাস পানি থাকে। সন্ত্রাসীরা আমাকেও জবাই করার হুমকি দিয়েছে বলে শুনেছি। তারা এলাকায় ত্রাসের রাজত্ব কায়েম করেছে। কৃষকদের বিষয়টি নিয়ে আমি মীমাংসা করার জন্য তাদের বারবার ডেকেও তারা আসেনি।

তবে অভিযোগ অস্বীকার করেছেন ইউপি সদস্য রফিকুল ইসলাম। তিনি বলেন, ‘বিলে চাইনিজ কুড়াল, হাসুয়া ও লাঠিশোটা নিয়ে মারামারি হয়েছে। আমি এ ঘটনায় জড়িত নই।'

এ বিষয়ে বাগমারা থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) আমিনুল ইসলাম বলেন, ‘মারামারির খবর পেয়ে পুলিশ ঘটনাস্থল পরিদর্শন করে। অভিযোগের প্রেক্ষিতে থানায় একটি মামলা দায়ের হয়েছে। আসামিদের গ্রেফতারে অভিযান চলছে। 

 

 

 

আরপি/এসআর-০২



আপনার মূল্যবান মতামত দিন:

Top