রাজশাহী বৃহঃস্পতিবার, ২৮শে জানুয়ারী ২০২১, ১৬ই মাঘ ১৪২৭


ছাত্রীর যৌন নিপীড়নের বিচার মীমাংসায় সারলেন কলেজ শিক্ষকরা


প্রকাশিত:
১০ জানুয়ারী ২০২১ ২১:০১

আপডেট:
২৮ জানুয়ারী ২০২১ ১১:০৮

ছবি: সংগৃহীত

 নাটোরের সিংড়ায় দেড় লাখ টাকায় কলেজ ছাত্রীকে যৌন নিপীড়নের ঘটনা মীমাংসা করেছেন কলেজের শিক্ষকরা। অত্যন্ত গোপনে অভিযুক্তকে লঘু শাস্তি আর দেড় লাখ টাকা জরিমানা করে এমন ঘটনা ধাপাচাপা দেয়ার ঘটনায় ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন এলাকাবাসী।

ঘটনাটি জানাজানি হলে অভিযান চালিয়ে অভিযুক্ত রেজাউল করিমকে গ্রেফতার করে আদালতের মাধ্যমে কারাগারে পাঠিয়েছে পুলিশ। স্থানীয়রা জানান, গত ২৮ ডিসেম্বর দ্বাদশ শ্রেণির ওই ছাত্রী তার চাচাতো বোনকে ষষ্ঠ শ্রেণিতে ভর্তি করাতে সিংড়া উপজেলার হাতিয়ান্দহ বালিকা উচ্চ বিদ্যালয় ও কলেজে যান। ভর্তির কাগজপত্র জমা দেয়ার পর অফিস সহকারী রেজাউল করিম কৌশলে কলেজ ছাত্রীকে পাশের রুমে ওজন মাপার কথা বলে নিয়ে যান। পরে কেউ না থাকার সুযোগে তাকে যৌন নিপীড়ন করেন।

ধস্তাধস্তির এক পর্যায়ে মেয়েটি নিজেকে ছাড়িয়ে ছোটবোনকে নিয়ে বাড়ি ফিরে ঘটনাটি পরিবারকে জানান। পরে মেয়েটির পরিবারের লোকজন ওই শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে গিয়ে অধ্যক্ষ ইসমাইল হোসেনকে ঘটনাটি জানান।

তখন থেকেই অধ্যক্ষ ঘটনাটি ধামাচাপা দিতে তৎপর হয়ে ওঠেন। তাকে সহযোগিতায় এগিয়ে যান সহকারী অধ্যাপক প্রবীর কুমার সাহা। তারই অংশ হিসেবে ২৯ ডিসেম্বর কলেজের এক রুমে অভিযুক্ত রেজাউলকে চড়-থাপ্পড় আর পা ধরে মাফ চাওয়ানো হয়। এছাড়া জরিমানা করা হয় দেড় লাখ টাকা।

ভুক্তভোগীর বাবা জানান, এ সময় কলেজ অধ্যক্ষ ইসমাইল হোসেন, সহকারী অধ্যাপক প্রবীর কুমার সাহা ছাড়াও উপস্থিত ছিলেন শেরকোল উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক রেজাউল ইসলাম, স্কুল ও কলেজ কমিটির সভাপতি ভেটু চৌধুরী, ডা. সামাদ, বিদ্যালয়ের শিক্ষক আমিনুল ইসলাম ও হাসান আলী।

পরে ৪ জানুয়ারি জরিমানার দেড় লাখ টাকা জনতা ব্যাংকের হাতিয়ান্দহ শাখার মাধ্যমে ভুক্তভোগী ও তার চাচাত বোনের মায়ের অ্যাকাউন্টে জমা দেন অফিস সহকারী রেজাউল।

তবে এনিয়ে অফিস সহকারী রেজাউলের মুখোমুখি হলে সব অস্বীকার করেন তিনি। রেজাউল করিম জানান, এ বিষয়ে তিনি কিছুই জানেন না। তবে ঘটনার কথা অকপটে স্বীকার করেন অধ্যক্ষ ইসমাইল হোসেন। তিনি বলেন, ছাত্রীটিকে যৌন নিপীড়নের সত্যতা পেয়ে ম্যানেজিং কমিটির লোকজন ও সহকারী অধ্যাপক প্রবীর কুমার সাহাকে নিয়ে সমঝোতা করে দিয়েছি। দেড় লাখ টাকা ভুক্তভোগী পরিবারকে দিয়েছি।

ফৌজদারি অপরাধ মিমাংসা করতে পারেন কিনা এমন প্রশ্নে তিনি বলেন, বিষয়টি আদালত পর্যন্ত গড়ালে মেয়েটির নানা ঝামেলা হত। তাই মিমাংসার উদ্যোগ নিয়েছি। সহকারী অধ্যাপক প্রবীর কুমার সাহা বলেন, সেদিন আমি কলেজে ছিলাম। তবে মীমাংসায় ছিলাম না। আর মিমাংসা হলেও ক্ষতি কী?

হাতিয়ান্দহ ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মাহাবুব-উল-আলম জানান, কলেজের অধ্যক্ষসহ কেউ তাকে এ বিষয়ে কিছু জানায়নি। ঘটনাটি তিনি লোকমুখে শুনেছেন। তিনি যতটুকু শুনেছেন সে অনুযায়ী এ ধরনের বিচার করা আইনের সুস্পষ্ট লঙ্ঘন।

নাটোরের পুলিশ সুপার সুপার লিটন কুমার সাহা জানান, খুব গোপনে বিষয়টি আপস মিমাংসা করা হয়েছে। যা মিমাংসা করার কোনোই সুযোগ নেই। ঘটনাটি জানার পরপরই বুধবার রাতে অভিযুক্ত রেজাউলকে আটক করা হয়। রাতেই তার নামে ভুক্তভোগী তরুণী যৌন নিপীড়নের অভিযোগ এনে মামলা দায়ের করেছেন। পরে অভিযুক্ত রেজাউলকে আদালতের মাধ্যমে কারাগারে পাঠানো হয়েছে। যৌন নিপীড়নের ঘটনা আপস মিমাংসাকারীদেরও আইনের আওতায় আনা হবে।

জেলা শিক্ষা অফিসার রমজান আলী আকন্দ জানান, ঘটনা অবগত হওয়ার পরপরই অধ্যক্ষের সঙ্গে কথা বলেছি। তিনি আপস মীমাংসার কথা স্বীকার করেছেন। ঘটনাটি তদন্তে তিন সদস্যের কমিটি গঠন করা হয়েছে। আগামী তিন দিনের মধ্যে তাদের প্রতিবেদন দিতে বলা হয়েছে। যারা যৌন নিপীড়নের মতো ঘটনা টাকা দিয়ে আপোস মীমাংসা করেছিল সেই শিক্ষকদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নিতে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানানো হবে।


 আরপি / এমবি-১৪



আপনার মূল্যবান মতামত দিন:

Top