রাজশাহী মঙ্গলবার, ৩০শে মে ২০২৩, ১৬ই জ্যৈষ্ঠ ১৪৩০


আ.লীগ নেতার নেওয়া ঘুষের টাকা ফেরত দিলেন ইউএনও


প্রকাশিত:
৬ মে ২০২৩ ০০:০৩

আপডেট:
৩০ মে ২০২৩ ০০:২০

ছবি: সংগৃহীত

নাটোরের গুরুদাসপুরে আশ্রয়ণ প্রকল্পে ঘর দেওয়ার নামে আওয়ামী লীগ নেতা নজরুল ইসলামের নেওয়া ঘুষের টাকা ফেরত দিলেন উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) শ্রাবণী রায়।

শুক্রবার (৫ মে) সকালে ভুক্তভোগীদের তার বাসভবনে ডেকে ওই টাকা ফেরত দেন।

এসময় ভুক্তভোগী ওই ৭ নারীর মধ্যে ৫ জনের টাকা ফেরত দেওয়া হলেও দুই জনের টাকা দেওয়া হয়নি।

ভুক্তভোগী ৭ নারী হলেন- নাজিরপুর ইউনিয়নের লক্ষীপুর গ্রামের রেজাউল করিমের স্ত্রী আসমা বেগম, ছাইফুল হোসেনের স্ত্রী ইঞ্জিরা বেগম, মৃত-হাসমত আলীর স্ত্রী রাবিয়া বেগম, মৃত-আবেদ আলীর স্ত্রী রিজিয়া বেগম, মৃত-তারামিয়ার স্ত্রী হাবিয়া বেগম, আব্দুল হামিদের স্ত্রী সাহারা বানু ও ইয়াছিন আলীর মেয়ে বিউটি খাতুন।

অভিযুক্ত নজরুল ইসলাম উপজেলা আওয়ামী লীগ সাংগঠনিক সম্পাদক ।

ভুক্তভোগীদের অভিযোগ সূত্রে জানা গেছে, উপজেলার নাজিরপুর ইউনিয়নের লক্ষীপুর গ্রামে মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর উপহারের আশ্রয়ণ প্রকল্পের ৯টি ঘর ভূমিহীন ও গৃহহীন নারীদের মাঝে হস্তান্তর করে উপজেলা প্রশাসন। সেই আশ্রয়ণে ঠাঁই হয়, আসমা, রাবিয়া, রিজিয়া, হাবিয়া, সাহারা ও বিউটির। তাদের মধ্যে কেউ বিধবা, কেউ স্বামী পরিত্যাক্তা। দিনমজুরি করে বর্তমানে তারা জীবিকা নির্বাহ করছেন। গত দুই মাস ধরে আশ্রয়ণ প্রকল্পের ঘরে বসবাস করছেন তারা। আনুমানিক ৬ মাস আগে আশ্রয়ণ প্রকল্পে ঘর দেওয়ার করার কথা বলে উপজেলা আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক নজরুল ইসলাম ঘর প্রতি ৫০ হাজার টাকা হাতিয়ে নেয়। প্রায় ৫ লাখ টাকার জায়গা জমিসহ ঘর পাবে এমন প্রতিশ্রুতি দিয়ে ৬ জন নারীর কাছ থেকে টাকা নেন তিনি।

এছাড়াও ইঞ্জিরা নামের আরও এক নারীর কাছ থেকে ঘর দেওয়ার কথা বলে ৪০ হাজার টাকা হাতিয়ে নিলেও তাকে ঘর দিতে পারেননি তিনি। হতদরিদ্র এই নারীরা পেশায় শ্রমজীবী। অন্যের বাড়িতে কাজ করে নিজেদের জীবন জীবিকা নির্বাহ করে থাকেন। ঘর বাবদ দেওয়া টাকা বিভিন্ন এনজিও থেকে ঋণ করে দিয়েছেন তারা। সেই টাকার কিস্তি প্রতি সপ্তাহে শ্রম বিক্রি করেই পরিশোধ করতে হচ্ছে।

পরে গত বুধবার ঘুষের টাকা ফেরত পেতে সাহারা খাতুন ও মমতাজ বেগম বাদী হয়ে নাটোর আমলি আদালতে মামলা দায়ের করেন। এ নিয়ে গণমাধ্যমে সংবাদ হয়। বিষয়টি প্রধানমন্ত্রীর দফতর ও জেলা প্রশাসকের নজরে আসে। এরই প্রেক্ষিতে গতকাল বৃহস্পতিবার অতিরিক্তি জেলা প্রশাসক (রাজস্ব) নূর মোহম্মদ মাসুম উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার দফতরে অভিযোগকারীদের শুনানি গ্রহণ করেন। এসময় অভিযুক্ত আ.লীগ নেতা নজরুল ইসলাম উপস্থিত ছিলেন না। এসময় শুনানিতে ইউএনও শ্রাবনী রায় ছাড়াও সহকারী কমিশনার (ভূমি) মেহেদী হাসান শাকিল উপস্থিত ছিলেন।

আজ সকাল সাড়ে ১০টার দিকে অভিযোগকারী আসমা বেগম ইঞ্জিরা বেগম, রাবিয়া বেগম, রিজিয়া বেগম, হাবিয়া বেগম, সাহারা বেগম ও মমতাজ বেগমকে ইউএনও তার বাসভবনে ডেকে নেন। সেখানে প্রায় কয়েক ঘণ্টা ধরে অভিযোগকারীদের সঙ্গে বৈঠক করেন উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) শ্রাবণী রায়।

এদিকে ঘুষের টাকা ফেরত দেওয়ার খবরটি ছড়িয়ে পড়লে স্থানীয় সংবাদকর্মীরা ইউএনওর বাসভবনের সামনে অবস্থান করেন। সংবাদকর্মীরা এ বিষয়ে জানতে ইউএনও শ্রাবনী রায়ের সঙ্গে কথা বলতে চাইলে অপারগতা প্রকাশ করেন তিনি। এমনকি তার ফোনে একাধিক বার কল করলেও তিনি ধরেননি। পরে বেলা ২টার দিকে ঘুষের টাকাসহ তার বাসভবনের পেছনের প্রাচীরে মই লাগিয়ে সেখান দিয়ে নামিয়ে দেওয়া হয় ভুক্তভোগী অনেক নারীকে।

ভুক্তভোগীরা জানান, ইউএনও শ্রাবনী রায় বৃহস্পতিবার রাতে টাকা ফেরত দেওয়া জন্য মুঠোফোনে শুক্রবার তার সরকারি বাসভবনে আসতে বলেছিলেন। আমরা সেজন্য তার বাসভবনে এসেছি।

পরে সকাল সাড়ে ১০টার দিকে এসেছি। সেখানে বিষয়টি গোপন রাখার শর্তে সাতজনের মধ্যে চারজনকে ৫০ হাজার করে এবং একজনকে ৪০ হাজার টাকা ফেরত দেওয়া হয়েছে। এসময় প্রাচীর টপকিয়ে পার হওয়া নারীদের মধ্যে আসমা বেগম সংবাদকর্মীদের জানান, সাংবাদিকদের দৃষ্টি এড়াতে ইউএনওর পরামর্শে তার গাড়িচালক জয়নাল হোসেনের সহায়তায় টাকাসহ মই বেয়ে প্রাচীর অতিক্রম করেছিলেন।

ভুক্তভোগী নারীরা অভিযোগ করে বলেন, গুরুদাসপুর উপজেলা আ.লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক নজরুল ইসলাম উপজেলার নাজিরপুর ইউনিয়নের লক্ষীপুর আশ্রয়ণ প্রকল্পে ঘর পাইয়ে দেওয়ার কথা বলে তাদের কাছ থেকে ৫০ হাজার টাকা করে ঘুষ নিয়েছিলেন।

ভুক্তভোগী ওই নারীরা জানান, শুনানি গ্রহণের পর বৃহস্পতিবার রাতে অভিযুক্ত নজরুল ইসলাম তাদের বাড়ি বাড়ি গিয়ে নিজের ভুল স্বীকার করে দুঃখ প্রকাশ করে এসেছেন। এবং তাদের টাকা ইউএনওর মাধ্যমে ফেরত পাবেন বলেও জানিয়েছিলেন। তার কথা ও ইউএনওর ফোনে আশ্বস্ত হয়ে শুক্রবার ইউএনওর বাস ভবনে এসে কথামত ঘুষের টাকা ফেরত পেয়েছেন তারা।

এ ব্যাপারে অভিযুক্ত আ.লীগ নেতা নজরুল ইসলাম কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি।

অভিযোগকারী নারীদের তার বাসভবনে ডেকে ঘুষের টাকা ফেরত দেওয়ার বিষয়ে জানতে উপজেলা নির্বাহী অফিসার (ইউএনও) শ্রাবণী রায়ের মুঠোফোনে একাধিকবার যোগাযোগ করলেও ফোন ধরেননি তিনি। তার বাসভবনে গেলেও সংবাদকর্মীদের সঙ্গে কথা বলতে রাজি হয়নি।

এ বিষযে জেলা প্রশাসক আবু নাছের ভূঞা বলেন, ভুক্তভোগী নারীরা অভিযোগের পাশাপাশি ইউএনওর কাছে টাকাগুলো উদ্ধার করে দেওয়ার জন্য আবেদন করেছেন। ঘটনা কি হয়েছে তা জেনে জানাবেন বলে তিনি জানান।

 

আরপি/এসআর



আপনার মূল্যবান মতামত দিন:

Top