রাজশাহী রবিবার, ২৫শে অক্টোবর ২০২০, ১০ই কার্তিক ১৪২৭


শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বন্ধই থাকুক


প্রকাশিত:
২৩ জুলাই ২০২০ ২০:৪২

আপডেট:
২৫ অক্টোবর ২০২০ ০২:০৫

আমানুল্লাহ আমান। ছবি: রাজশাহী পোস্ট

মহামারী করোনা ভাইরাসের প্রভাবে বিশ্বে অচলাবস্থার সৃষ্টি হয়েছে। এরইমধ্যে বন্ধ রয়েছে দেশের সব শিক্ষা প্রতিষ্ঠান। বাংলাদেশে প্রথম করোনা শনাক্ত হয় ৮ মার্চ। আর ১৭ মার্চ সকল শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বন্ধ করে দেয় সরকার। পরিস্থিতি স্বাভাবিক না হলে খোলার কোনো সম্ভাবনা নেই। তবে গুঞ্জন শোনা যাচ্ছে ঈদুল আজহার পর খুলতে পারে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান। তবে এটাকে গুজব বলেই উড়িয়ে দিয়েছে শিক্ষা মন্ত্রণালয়।

শিক্ষার্থীরাও আশা করছেন, ঈদের পরই আসবেন প্রিয় প্রতিষ্ঠানে। যদিও এর আগে ১২ জুলাই থেকে খুলে দেয়া হয়েছে মাদরাসার হেফজ বিভাগ। আর বৃহস্পতিবার (২৩ জুলাই) ‘আল-হাইআতুল উলয়া লিল-জামি‘আতিল কওমিয়া বাংলাদেশের’ কার্যালয়ে অনুষ্ঠিত স্থায়ী কমিটির সভায় আগামী ৮ আগস্ট থেকে স্বাস্থ্যবিধি মেনে সারাদেশের কওমি মাদ্রাসাগুলো খুলবে বলে সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়েছে।

তবে কোভিড-১৯ নিয়ন্ত্রনে না আসা পর্যন্ত কোনো ধরণের শিক্ষা প্রতিষ্ঠান চালু করা মোটেও উচিত হবে না। বর্তমান পরিস্থিতিতে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান চালু করা আত্মঘাতী সিদ্ধান্ত হবে। শিক্ষার্থীদেরকে ঝুঁকির মধ্যে ফেলে দেয়া কোনোভাবে সমীচীন নয়। করোনাকালে সীমিত আকারে সবকিছু খুলে দেয়া হয়েছে। দীর্ঘ সময় শিক্ষার্থীরা বাসায় থেকে উদ্বিগ্ন। তবুও শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বন্ধই রাখতে হবে।

শিক্ষা প্রতিষ্ঠান চালু হলে একই শ্রেণীতে কিংবা ছাত্রাবাসে একসাথে অবস্থান করবে শিক্ষার্থীরা। স্বাস্থবিধি মানার জন্য কঠোর হলেও তা মানানো সম্ভব হবে না। একইসাথে আড্ডা, গল্প, বাইরে ঘুরতে যাওয়া কোনোভাবেই ঠেকানো যাবে না। সংক্রামক মহামারীতে আক্রান্ত হবে হাজার হাজার দেশের উজ্জ¦ল ভবিষ্যৎ। অকালে ঝরে যেতে পারে শত শত প্রাণ। জাতির মেরূদণ্ড শিক্ষার আলো নিভে আগামীতে ঘোর অমানিশা নামতে পারে দেশে। যেটির ধাক্কা সামলাতে যেকোনা সরকার ব্যর্থ হবে।

মহামারীর এই সময়ে বিকল্প হিসেবে কাজে লাগাতে হবে প্রযুক্তিকে। উন্নত বিশ্বে প্রযুক্তির সুবিধা নিয়ে ঘরে বসেই সবকিছু সম্ভবকর হচ্ছে। আর সংকটকালে বাংলাদেশে এর ব্যবহার করা না গেলে এটা ডিজিটাল বাংলাদেশের রূপকারদের জন্য হবে চরম ব্যর্থতা ও লজ্জার।

বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ইতোমধ্যে শুরু হয়েছে অনলাইনে ক্লাস। তবে এত নানাবিধ অসুবিধা পরিলক্ষিত হচ্ছে। সিম অপারেটরগুলো উচ্চগতির ইন্টারনেট সরবরাহে ব্যর্থ। এদিকে বিনামূল্যে ইন্টারনেট দেয়ার পরিবর্তে উল্টো ফ্রি ফেসবুক ম্যাসেনজার বন্ধ করে দেয়া হয়েছে।
বিটিআরসি বলছে, বিনামূল্যের ইন্টারনেট দেওয়া যাবে না। এতে বাজারে অসুস্থ্য প্রতিযোগিতা হয় এবং অনেকে বিনামূল্যের এসব প্যাকেজ ব্যবহার করে 'অপ্রয়োজনীয় অপরাধমূলক' কর্মকাণ্ড করে।

অনলাইন ক্লাসে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান কর্তৃপক্ষের প্রস্তুতিতে যথেষ্ট ঘাটতি রয়েছে। প্রযুক্তিগত সীমাবদ্ধতার কারণে পিছিয়ে যাওয়ার ঝুঁকিতেও রয়েছে প্রত্যন্ত ও অসচ্ছল শিক্ষার্থীদের একটা বড় অংশ।
এদিকে শিক্ষার্থীদের বিনামূল্যে ইন্টারনেট প্যাকেজ প্রদানের জন্য মোবাইল অপারেট কোম্পানিগুলোর প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন শিক্ষামন্ত্রী ডা. দীপু।

গত ৬ জুলাই এক সেমিনারে তিনি বলেছেন, অনেক শিক্ষার্থীর পক্ষেই ইন্টারনেটের ব্যয় বহন করা সম্ভব হচ্ছে না। এক্ষেত্রে শিক্ষার্থীদের জন্য বিনামূল্যে ইন্টারনেট প্রদান অথবা স্বল্পমূল্যে ইন্টারনেট প্যাকেজ দেয়া গেলে সহজ হতো। এ ব্যাপারে মোবাইল অপারেটর কোম্পানিগুলোর সঙ্গে আলোচনা চলছে । মোবাইল কোম্পানিগুলো বিষয়টি ইতিবাচক দৃষ্টিতে দেখবে বলেও আশা করেন শিক্ষামন্ত্রী।

তবে মোবাইল অপারেটর কোম্পানিগুলোর এখনো পর্যন্ত নেই কোনো ইতিবাচক সাড়া। ফলে অনলাইনে ক্লাস থেকে ছিটকে পড়ছে সিংহভাগ শিক্ষার্থী।

সরকারের আরেক মন্ত্রী স্বীকার করেই নিলেন, বিনামূল্যে ইন্টারনেট পাওয়া শিক্ষার্থীদের অধিকার। শিক্ষার্থীদের বইয়ের আগে ইন্টারনেটের চাহিদার বিষয়টি বুঝেছেন তিনি।

গত ৬ জুন ডাক ও টেলিযোগাযোগ মন্ত্রী মোস্তফা জব্বার বলেন, শিক্ষার্থীদের যেভাবে বই দেওয়া হচ্ছে, আমার তো মনে হয় তারা এখন বলবে আমাকে বই একটু পরে দিও, আগে ইন্টারনেট দাও। তাহলে তো বিনামূল্যে ইন্টারনেট পাওয়াটাও তার অধিকারের মধ্যে পড়ছে। স্বল্পমূল্যে ইন্টারনেট ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে বিনামূল্যে ওয়াইফাই দেওয়ার আশ্বাস দেন তিনি।

কিন্তু শিক্ষার্থীদের ভাগ্যের চাকা এখনো ঘুরেনি। পাচ্ছে না বিনামূল্যে ইন্টারনেট, নেই উচ্চগতির সেবা--সবমিলিয়ে চরম অনিশ্চয়তায় শিক্ষার্থীদের ভবিষ্যৎ।

এদিকে কিছু কিছু শিক্ষা প্রতিষ্ঠান থেকে শিক্ষার্থীদের ইন্টারনেট সরবরাহ ও আর্থিক প্রণোদনা প্যাকেজ দেয়া হচ্ছে।

গ্রিন ইউনিভার্সিটি বাংলাদেশ শিক্ষার্থীদের পড়াশোনা স্বাভাবিক রাখতে ৮ কোটি টাকার শিক্ষা প্রণোদনা প্যাকেজ ঘোষণা করেছে। এর আওতায় শিক্ষার্থীরা টিউশন ফি মওকুফ, আর্থিক সুবিধা ও ইন্টারনেট ডাটা খরচসহ শিক্ষাসংক্রান্ত নানা ধরনের আর্থিক সহায়তা পাচ্ছেন। প্রণোদনার প্যাকেজে কোনো শিক্ষার্থী করোনায় আক্রান্ত হলে আবেদন সাপেক্ষে টিউশন ফি মওকুফসহ তাকে অন্যান্য আর্থিক সহায়তা করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ। অন্যদিকে নতুন ভর্তি হওয়া শিক্ষার্থীরা সম্পূর্ণ টিউশন ফির উপর সর্বনিম্ন ২০ শতাংশ থেকে সর্বোচ্চ ১০০ শতাংশ পর্যন্ত ছাড় পেয়েছেন।

ইস্ট ডেল্টা ইউনিভার্সিটি (ইডিইউ) কর্তৃপক্ষ করোনা ভাইরাসের দুর্যোগে অনলাইন পাঠদানে প্রতি মাসে মাথাপিছু ৩০ জিবি ইন্টারনেট ডাটা বিনামূল্যে প্রদান করছে। শিক্ষার্থীদের সুবিধার্থে প্রতিষ্ঠানটি নিয়েছে নানা পদক্ষেপ। ক্যাম্পাস ক্লাস থেকে অনলাইনে রূপান্তরের এ যাত্রায় আর্থিক সহযোগিতাও করছে তারা।

তবে করোনাকালেও বেসরকারী প্রায় সকল শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতে কড়ায়-গণ্ডায় বিভিন্ন ফি আদায় করা হচ্ছে। যা অত্যন্ত দু:খজনক। শিক্ষা বাণিজ্যের ভয়াল থাবায় নির্ঘুম রাত কাটাচ্ছে হাজারো অভিভাবক। এরইমধ্যে বন্যা কবলিত অঞ্চলের মানুষদের আর্তনাদ এখনো কানে যাচ্ছেনা অসাধু জনপ্রতিনিধিদের।

এ মুহূর্তে শিক্ষা বাণিজ্যের যেমন লাগাম টানা দরকার। তেমন দরকার শিক্ষার্থীদের জন্য বিনামূল্যে উচ্চগতির ইন্টারনেট। ইস্ট ডেল্টা বা গ্রিন ইউনিভার্সিটির মতো এগিয়ে আসতে হবে সকল শিক্ষা প্রতিষ্ঠান কর্তৃপক্ষকে। আর প্রযুক্তির ব্যবহার নিশ্চিত করতে সরকারকেই সক্রিয় ভূমিকা পালন করতে হবে। সর্বোপরি করোনা পরিস্থিতি স্বাভাবিক না হওয়া পর্যন্ত বন্ধই রাখতে হবে সকল শিক্ষা প্রতিষ্ঠান। এটাই জাতির জন্য মঙ্গলজনক আর সরকারের জন্য সময়োপযোগী সিদ্ধান্ত হবে। তাই বন্ধই থাকুক সকল শিক্ষা প্রতিষ্ঠান।

লেখক: সাংবাদিক ও কলামিস্ট




আপনার মূল্যবান মতামত দিন:

Top