নগরীজুড়ে সুবাস ছড়ানো ছাতিম ফুলের হাসি

সময়টা এখন ছাতিম ফুলের। নগর জীবনের সারাদিনের ক্লান্তি দুর করতে ছাতিম গাছ যেন তার সুবাসিত শিশি উপুড় করে দেয় সন্ধ্যার বাতাসে। নিজের ধাঁচের সুবাস বাতাসে ছড়িয়ে পরে অনেক দুর। আর সেই ঘ্রাণে কংক্রিটের দেয়ালে বন্দি মানুষগুলোর মন যেন আমোদিত হয়ে উঠে।
রাজশাহী মহানগরীর রাস্তার দুই পাশে বেড়ে উঠা ছাতিম গাছগুলোতে ফুল ধরেছে। প্রকৃতিতে বয়ে বেড়ানো হালকা বাতাসের সাথে থেকে ভেসে আসে বুনো ফুল ছাতিমের মিষ্টি ঘ্রাণ। সূর্য যখন ক্লান্ত বেলায় তখন থেকেই মায়াবী এ ঘ্রাণ ছড়াতে শুরু করে। আরো বাড়ে রাতে।
রাজশাহী মহানগরীর শহিদ এএইচএম কামারুজ্জামান চত্বর থেকে শুরু হয়ে গ্রেটার রোডের পুরো ফুটপাতই ছাতিম ফুলের গাছ। আশেপাশের এলাকায় বাতাস ছাতিম ফুলের ঘ্রাণে আমোদিত। এ সুবাসে মুগ্ধ হয় পথচারী। সাদা সাদা ফুলে ঢেকে থাকে পুরো গাছ। বিশেষ করে সন্ধ্যা থেকে শুরু করে রাতের পুরো সময়টায় এ ছাতিম ফুল ঘ্রাণ ছড়ায়। রাত বাড়ার সাথে সাথে পুরো এলাকা যেন হয়ে পড়ে মাদকতাময়। চাঁদের আলোতে দেখা যায় সারা গাছ ছেয়ে থাকা গুচ্ছ গুচ্ছ সাদা ফুল।
রাজশাহী সিটি কপোরেশন সূত্রে জানা যায়, মেয়র এএইচএম খায়রুজ্জামান লিটন প্রথমবার মেয়র থাকাকালীন ২০০৮ থেকে ২০১৩ সাল পর্যন্ত সবুজের মহানগরীতে পরিণত করাসহ দীর্ঘমেয়াদি বিভিন্ন পদক্ষেপ গ্রহণ করেন। পরিবেশ সুরক্ষা, জলবায়ুর পরিবর্তনজনিত প্রভাব ঠেকাতে এবং শহরের রাস্তা ও ফুটপাত বাদে ফাঁকা জায়গাগুলো সবুজ গাছে ঢেকে দিতে ‘জিরো সয়েল’ প্রকল্প গ্রহণ করেন তিনি। প্রকল্পটি বাস্তবায়নের ফলে সবুজ ও বিচিত্র ফুলের সমাহারে নতুন রূপ পেয়েছে নগরী। নগরীকে সবুজের সঙ্গে সুবাসিত করতে তিনি বিভিন্ন রাস্তার ফুটপাতে ছাতিম ফুলের গাছ রোপন করেন। নগরজুড়ে রাস্তাগুলোতে রোপন করা এসব গাছের পরিচর্যা সিটি মেয়র নিজে তদারকি করেন।
রাজশাহী মহানগরীর দড়িখরবোনা এলাকার ফ্লেক্সিলোডের দোকানি সবুজ জানান, তার দোকানের সামনেই একটি ছাতিম গাছ আছে। সেখানে ফুল ফুটতে শুরু করেছে। সন্ধ্যা নামতেই আশেপাশের এলাকা সুবাসিত হতে শুরু হয়। একেবারে মন মাতানো ঘ্রাণ।
ছাতিম গাছের পরিচয়: চিরসবুজ দুধকষভরা সুশ্রী গাছ ছাতিম। পাতা প্রায় ১৮ সেমি লম্বা, মসৃণ, ওপরের দিকটা উজ্জ্বল সবুজ, নিচটা সাদাটে। শরতের শেষে সারা গাছ ভরে গুচ্ছবদ্ধ, তীব্রগন্ধী, সবুজ-সাদা ছোট ছোট ফুল ফোটে। ফল সজোড়, থোকায় থোকায় ঝুলে থাকে। এর আদি আবাস ভারত, চীন ও মালয়েশিয়ায়। ছোট ছাতিম বাংলাদেশের উপকূলীয় অঞ্চলে জন্মে। ফুল সাদা ও আকারে কিছুটা বড়। এ গাছের সংস্কৃত নাম সপ্তপর্ণী। অঞ্চলভেদে একে ছাতিয়ান, ছাইত্যানসহ নানা নামে ডাকা হয়। ছাতিম ঘিরে অনেক মিথও রয়েছে। এ গাছে নাকি ভূত থাকে তাই একে শয়তানের গাছও বলে। পশ্চিমা বিশ্বেও আছে ছাতিমের বদনাম, ইংরেজিতে একে ডাকা হয় ‘ডেভিলস ট্রি’ নামে। বৈজ্ঞানিক নাম অষংঃড়হরধ ঝপযড়ষধৎরং। স্কলারিস শব্দটির সাথে বিদ্যা অর্থাৎ লেখাপড়ার যোগ আছে। এ ধরনের নামকরণের কারণ, ছাতিমের নরম কাঠ থেকে ব্ল্যাকবোর্ড ও পেনসিল তৈরি হয়। এ ছাড়া প্যাকিং বাক্স তৈরির জন্যও এর কাঠ ব্যবহার করা হয়। এর ফুল ফোটার মওসুম শরৎ-হেমন্তকালে। কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের প্রিয় ফুলগুলোর মধ্যে এটি ছিল অন্যতম। তাই শান্তিনিকেতনে দেখা মেলে অজস্র ছাতিম গাছের।
এক সময় গ্রামের রাস্তার পাশে, বনে-জঙ্গলে অহরহ এ গাছ থাকলেও বর্তমানে খুব একটা খুঁজে পাওয়া যায় না ছাতিম গাছ। দূর থেকে ভেসে আসা সুঘ্রাণ শুঁকে গাছটিকে খুঁজে নিতে হয়। নির্বিচারে গাছ কেটে বিক্রি করা বা বসতবাড়ি নির্মাণের ফলে অন্যান্য গাছের সাথে উজাড় হতে হতে এখন এ ছাতিম গাছের দেখা মেলে না বললেই চলে।
আরপি/এসআর
আপনার মূল্যবান মতামত দিন: