রাজশাহী মঙ্গলবার, ১৫ই জুন ২০২১, ২রা আষাঢ় ১৪২৮


মানুষ মারা যাওয়ার পর শুরু হয় যেসব কাজ


প্রকাশিত:
২ জুন ২০২১ ১০:৫৫

আপডেট:
১৫ জুন ২০২১ ০৯:৫১

 

শায়খ আব্দুল্লাহ যারাল্লাহ রাহমাতুল্লাহি আলাইহি। কুয়েতের একজন প্রসিদ্ধ লেখক। তিনি তার মৃত্যুর আগে এমন কিছু অনুভূতি লিখে গেছেন- যা একজন মানুষের মৃত্যুর পর থেকে শুরু হয়। অনুভূতি প্রকাশ করতে গিয়ে তিনি প্রথম কাজটির কথা এভাবে তুলে ধরেন-

يُجَرِّدُونَنِي مِنْ مَلَابِسِي


তারা প্রথমে আমার পরনের পোশাক খুলে আমাকে বিবস্ত্র করবে।

কুয়েতি লেখক শায়খ আব্দুল্লাহ যারাল্লাহ (রাহ.) মৃত্যুর পর মানুষের সঙ্গে করা আচরণ থেকে শুরু করে পরবর্তী সময়ের কাজের ধারাবাহিক ধাপ ও কিছু অকল্পনীয় দিকনির্দেশনা তুলে ধরেছেন। একজন মানুষের সঠিক পথ প্রাপ্তিতে এ দিকনির্দেশনা খুবই জরুরি। যা পাঠকদের জন্য তুলে ধরা হলো-

মৃত্যুর আগে আব্দুল্লাহ যারাল্লাহ’র লিখে যাওয়া কিছু অনুভূতিগুলো-

‘মৃত্যু নিয়ে আমি কোনো দুশ্চিন্তা করব না; আমার মৃতদেহের কি হবে সেটা নিয়ে কোনো অযথা আগ্রহ দেখাব না। আমি জানি, আমার মুসলিম ভাইয়েরা মৃত্যু পরবর্তী সব করণীয়গুলোই যথাযথভাবে পালন করবে।’


শুরুতেই-

يُجَرِّدُونَنِي مِنْ مَلَابِسِي

তারা প্রথমে আমার পরনের পোশাক খুলে আমাকে বিবস্ত্র করবে।

يَغْسِلُونَني

আমাকে গোসল করাবে।

يَكْفِنُونَنِي

(তারপর) আমাকে কাফন পড়াবে।

يُخْرِجُونَنِي مِنْ بَيْتِي

আমাকে আমার (বসবাসের)ঘর থেকে বের করবে।

يَذهَبُونَ بِي لِمَسَكِنِي الجَدِيدِ (القَبْرُ)

আমাকে নিয়ে তারা আমার নতুন বাসস্থানের (কবর) দিকে রওয়ানা হবে।

وَسَيَأتِي كَثِيرُونَ لِتَشْيِيْعِ الجَنَازَتِي

আর আমাকে বিদায় জানাতে বহু মানুষের সমাগম হবে।

بَلْ سَيَلْغِي الكَثِيرُ مِنهُم أَعْمَالَهُ وَمَوَاعِيدَهُ لِأَجْلِي دَفْنِي

অনেক মানুষ আমাকে দাফন দেওয়ার জন্য তাদের কাজকর্ম কিংবা সভার সময়সূচি বাতিল করবে।

আফসোস…

وَقَدْ يَكُونُ الكَثِيرُ مِنهُم لَمْ يَفَكِّرْ في نَصِيحَتِي يَوماً مِنْ الأيّامِ

কিন্তু দুঃখজনক যে, অধিকাংশ মানুষ এর পরের দিনগুলোতে আমার এই উপদেশগুলো নিয়ে গভীরভাবে চিন্তা-ভাবনা করবে না।

যেসব জিনিসের অধিকার হারাবো…

أَشْيَائِي سَيَتِمُّ التَّخَلُّصُ مِنهَا

আমার (ব্যক্তিগত) জিনিসের উপর আমি অধিকার হারাব-

مَفَاتِيحِي

আমার চাবির গোছাগুলো,

كِتَابِي

আমার বইপত্র,

حَقِيبَتِي

আমার ব্যাগ,

أَحْذِيَتِي

আমার জুতাগুলো,

অতঃপর আমার পরিবার…

وإنْ كانَ أَهْلِي مُوَفِّقِينَ فَسَوفَ يَتَصَدِّقُونَ بِها لِتَنْفَعَنِي

হয়তো আমার পরিবারের লোকেরা আমাকে উপকৃত করার জন্য আমার ব্যবহারের জিনিসপত্র দান করে দেওয়ার বিষয়ে একমত হবে।

মানুষের মৃত্যুতে যা বন্ধ হবে না, বরং চলতে থাকবে-

تَأَكِّدُوا بِأَنَّ الدُّنيا لَنْ تَحْزَنْ عَلَيَّ

এ বিষয়ে তোমরা নিশ্চিত থেকো যে, (মৃত্যুর পর) এই দুনিয়া তোমার জন্য দুঃখিত হবে না; অপেক্ষাও করবে না।

وَلَنْ تَتَوَقَّفْ حَرَكَةُ العَالَمِ

এই দুনিয়ার ছুটে চলা এক মুহূর্তের জন্যও থেমে যাবে না,

وَالاِقْتِصَادُ سَيَسْتَمِرُ

অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড কিংবা ব্যবসাবাণিজ্য সবকিছু চলতে থাকবে,

وَوَظِيْفَتِي سَيَأتِي غَيرِي لِيَقُومَ بَها

আমার দায়িত্ব (কাজ) অন্য কেউ সম্পাদন করা শুরু করবে,

রেখে যাওয়া সম্পদ নিয়ে যা হবে…

وَأَمْوَالِي سِيَذْهَبُ حَلَالاً لِلوَرَثِةِ

আমার ধনসম্পদ বিধিসম্মতভাবে আমার ওয়ারিসদের হাতে চলে যাবে,

بَينَمَا أنا سَأُحَاسِبُ عَليها

অথচ এর মাঝে এই সম্পদের জন্য আমার হিসাব-নিকাশ আরম্ভ হয়ে যাবে,

القَلِيلُ والكَثِيرُ.....النَقِيرُ والقَطمِيرُ......

ছোট এবং বড়….অনুপরিমাণ এবং কিয়দংশ পরিমাণ (সবকিছুর হিসাব)

মৃত্যুর পর মানুষ প্রথম যা হারাবে...

وَإن أَوَّلَ ما مَوتِي هو اِسمِي !!!!

আমার মৃত্যুর পর সর্বপ্রথম যা (হারাতে) হবে, তা হচ্ছে আমার নাম!!!

لِذَلكَ عِنْذَما يَمُوتُ سَيَقُولُونَ عَنِّي أَينَ "الجُنَّةُت"...؟

কেননা, যখন আমি মৃত্যুবরণ করবো, তারা আমাকে উদ্দেশ্যে (নাম ধরে না ডেকে) বলবে, কোথায় ‘লাশ’?

وَلَن يَنَادُونِي بَاِسمِي....

কেউ আমাকে আমার নাম ধরে সম্বোধন করবে না,

وَعِندَما يُرِيدُونَ الصَّلاةَ عَلَيَّ سِيَقُلُونَ اُحْضُرُوا "الجَنَازَةَ" !!!

যখন তারা আমার জন্য (জানাযার) নামাজ আদায় করবে, বলবে, “জানাযাহ” নিয়ে আসো,

وَلَن يُنَادُونِي يِاسْمِي ....!

তারা আমাকে নাম ধরে সম্বোধন করবে না….!

وَعِندَما يَشْرَعُونَ بِدَفنِي سَيَقُولُونَ قَرِّبُوا المَوتَ وَلَنْ يَذكُرُوا اِسمِي ....!

আর, যখন তারা দাফন শুরু করবে তখনও বলবে, মৃতদেহকে কাছে আনো, তারা আমার নাম ধরে ডাকবে না…!

সুতরাং নাম পরিচয়-পদমর্যাদা থেকে সাবধান…

لِذَلِكَ لَن يَغُرَّنِي نَسبِي وَلا قَبِيلَتِي وَلَن يَغُرَّنِي مَنْصَبِي وَلا شَهرَتِي ....

এজন্যই দুনিয়ায় আমার বংশপরিচয়, আমার গোত্র পরিচয়, আমার পদমযার্দা, এবং আমার খ্যাতি কোনকিছুই আমাকে যেন ধোঁকায় না ফেলে,

فَمَا أَتْفَهُ هَذِهِ الدُّنْيَا وَمَا أَعْظَمَ مُقَلِّبُونَ عَليهِ .....

এই দুনিয়ার জীবন কতই না তুচ্ছ, আর, যা কিছু সামনে আসছে (কবরে) তা কতই না গুরুতর বিষয়…

মৃতব্যক্তির জন্য দুঃখ হবে এমন…

فَيا أَيُّهَا الحَيُّ الآنَ ..... اِعْلَمْ أَنَّ الحُزْنَ عَليكَ سَيَكُونُ على ثَلَاثَةٍ أَنْواعٍ:

অতএব, (শোন) তোমরা যারা এখনো জীবিত আছ…, জেনে রাখ! তোমার (মৃত্যুর পর) তোমার জন্য তিনভাবে দুঃখ করা হবে-

১. النَّاسُ الَّذِينَ يَعْرِفُونَكَ سَطْحَيّاً سَيَقُولُونَ مِسْكِينٌ

যারা তোমাকে বাহ্যিক ভাবে চিনতো, তারা তোমাকে বলবে হতভাগা,

২. أَصْدِقَاؤُكَ سَيَحْزُنُونَ سَاعَات أَو أَيَّامَاً ثُمَّ يَعُودُونَ إِلَى حَدِيثِهِم بَلْ وَضَحِكَهُم

তোমার বন্ধুরা বড়জোর তোমার জন্য কয়েক ঘন্টা বা কয়েক দিন দুঃখ করবে, তারপর তারা আবার গল্পগুজব বা হাসি-ঠাট্টাতে মেতে ওঠবে

৩. الحُزْنُ العَمِيقُ فِي البَيْتِ سَيَحْزُنُ أَهْلِكَ أُسْبُوعاً.... أُيسْبُوعَينِ.... شَهراً ....شَهرَينِ أَو حَتَّى سَنَةً وَبَعْدَهَا سَيَضْعُونَكَ فِي أَرْشِيفِ الذَّكَرِيّاتِ !!!

যারা খুব গভীর ভাবে দুঃখিত হবে- তারা তোমার পরিবারের মানুষ, তারা এক সপ্তাহ, দুই সপ্তাহ, একমাস, দুইমাস কিংবা বড় জোর একবছর দু:খ করবে। এরপর, তারা তোমাকে স্মৃতির মণিকোঠায় যত্ন করে রেখে দেবে!!!

শুরু হবে নতুন গল্প…

اِنْتَهَتْ قِصَّتُكَ بَينَ النَّاسِ وَبَدَأَتْ قِصَّتُكَ الحَقِيْقِيّةِ وَهِيَ الآخِرةُ ....

মানুষদের মাঝে তোমাকে নিয়ে গল্প শেষ হয়ে যাবে, অতঃপর, তোমার জীবনের নতুন গল্প শুরু হবে, আর তা হবে পরকালের জীবনের বাস্তবতা।

لَقدْ زَالَ عِندَكَ

তোমার কাছ থেকে নিঃশেষ হবে (তোমার)-

১. الجَمَالُ : সৌন্দর্য্য

২. والمَالُ : ধন-সম্পদ

৩. والصَحَّةُ : সুস্বাস্থ্য

৪. والوَلَدُ : সন্তান-সন্তদি

৫. فَارقَت الدَّور: বসতবাড়ি

৬. القُصُورُ: প্রাসাদসমূহ

৭. الزَوجُ: জীবনসঙ্গী

মনে রাখতে হবে…

وَلَمْ يَبْقِ إِلَّا عَمَلُكَ

তোমার কাছে তোমার ভালো অথবা মন্দ আমল ছাড়া আর কিছুই অবশিষ্ট থাকবে না;

وَبَدَأَتِ الحَيَاةُ الحَقِيقَيَّةُ

শুরু হবে তোমার নতুন জীবনের বাস্তবতা…

নতুন জীবনের প্রশ্ন হবে-

وَالسُّؤَالُ هُنا : ماذا أَعْدَدْتَ لِلقُبَرِكَ وَآخِرَةَكَ مِنَ الآنَ ؟؟؟

আর সে জীবনের প্রশ্ন হবে: তুমি কবর আর পরকালের জীবনের জন্য এখন কী প্রস্তুত করে এনেছো?

সুতরাং জীবিত সব মানুষের যেসব বিষয় ভাবা জরুরি-

هَذِهِ حَقِيقَةٌ تَحْتَاجُ إلى تَأمَّلٍ

বস্তুতঃ এই জীবনের বাস্তবতা সম্পর্কে তোমাকে গভীরভাবে মনোনিবেশ করা প্রয়োজন-

لِذَلِكَ أحرصُ عَلى :

এজন্য ‍তুমি যত্নবান হও:

১. الفَرَائِضِ: ফরজ ইবাদতগুলোর প্রতি

২. النَّوَافِلِ : নফল ইবাদতগুলোর প্রতি

৩. صَدَقَةُ السِّرِّ : গোপন সাদাকাহ’র প্রতি

৪. عَمَلُ الصَّلِحِ : ভালো কাজের প্রতি

৫. صَلاةُ اللَّيلِ : রাতের নামাজের প্রতি

জীবিতদের প্রতি লেখকের প্রত্যাশা...

لَعَلَّكَ تَنْجُو....

যেন তুমি নিজেকে (মৃত্যুর পর) রক্ষা করতে পারো….

إِنْ سَاعَدْتَ عَلى تَذْكِيرِ النَّاسِ بِهَذِهِ المُقَالَةِ وَأنتَ حَيُّ الآنَ سَتَجِدُ أَثَرَ تَذكِيرِكَ في مِيزَانِكَ يَومَ القِيامَةِ بِإِذْنِ اللهِ .....

এই লেখাটির মাধ্যমে তুমি মানুষকে উপদেশ দিতে পারো, কারণ তুমি এখনও জীবিত আছো, এর ফলাফল আল্লাহর ইচ্ছায় তুমি কেয়ামতের দিন মিজানের পাল্লায় দেখতে পাবে,

যেমনভিাবে আল্লাহ বলেছেন-

قال الله تَعالى : ((فَذَكِّرْ فَإِنَّ الذِّكْرَ تَنْفَعُ المُؤمِنِينَ))

আল্লাহ বলেন: ((আর স্মরণ করিয়ে দাও, নিশ্চয়ই এই স্মরণ মুমিনদের জন্য উপকারী))

সাদকা প্রতি উৎসাহ...

لِمَاذَا يَخْتَارُ المَيِّتِ "الصَّدَقَةَ لو رَجَعَ للدُّنيا....

তুমি কি জান! কেন মৃতব্যক্তিরা সাদকাহ দেওয়ার আকাঙ্খা করবে, যদি তারা আর একবার দুনিয়ার জীবনে ফিরে আসতে পারতো?

كَمَا قَالَ تَعَالى: ((رَبِّ لَو لا أَخَّرْتَنِي إلى أَجَلٍ قَرِيبٍ فَأَصَّدَّقَ....))

আল্লাহ বলেন: ((হে আমার রব! যদি তুমি আমাকে আর একটু সুযোগ দিতে দুনিয়ার জীবনে ফিরে যাবার, তাহলে আমি অবশ্যই সাদকাহ প্রদান করতাম….))

সাদকাহ ছাড়া এসব নেক আমল করার আকাঙ্খা করবে না-

ولَمْ يَقُلْ :

তারা বলবে না-

لِأعتَمَرَ : ওমরাহ পালন করতাম,

أو لِأُصَلَّي : অথবা, সালাত আদায় করতাম,

أو لِأصُومُ : অথবা, রোজা রাখতাম,

কারণ…

قالَ العُلَماءُ : ما ذَكَرَ المَيِّتُ الصَّدَقَةَ إلا لِعَظِيمِ مَا رَأى مِن أَثَرِها بَعدَ مَوتِهِ

আলেমগণ বলেন: মৃতব্যক্তিরা সাদকাহর কথা বলবে এ কারণে যে, তারা সাদকাহ দেওয়ার ফলাফল তাদের মৃত্যুর পরপরই দেখতে পাবে।

সাদকার সাওয়াব পাওয়ার জন্য সবার মনে রাখা জরুরি…

فَأَكْثِرُوا مِنَ الصَّدَقَةِ وَمِن أَفضَلِ ما تَتَصَدَّقُ بِهِ الآنَ عشر ثَوَان مِنْ وَقْتِكَ لِنشَرِ هذا الكَلامَ بِنِيَّةِ النَّصْحِ فَالكَلمَةُ الطَّيِّبَةُ صَدَقَةٌ.

আর, গুরুত্ববহ এই সাদকার কাজটি তুমি এই কথাগুলো ছড়িয়ে দিয়ে (যে কোনো ভালো কথা বা হাসিমুখে কথা বলে) মাত্র ১০ সেকেণ্ড সময় ব্যয় করেই পেতে পারো। যদি তোমার উদ্দেশ্য হয় এর মাধ্যমে মানুষকে উপদেশ প্রদান করা। কেননা, উত্তম কথা হল এক ধরণের সাদকাহ।

আল্লাহ তাআলা মুসলিম উম্মাহকে লেখকের অনুভূতিগুলো হৃদয় দিয়ে উপলব্দি করার মাধ্যমে পরকালকে সুন্দর করার কাজে নিজেদের আত্মনিয়োগ করার তাওফিক দান করুন। লেখককে জান্নাতের সর্বোচ্চ মাকাম দান করুন। আমিন।

 

আরপি / আইএইচ



আপনার মূল্যবান মতামত দিন:

Top