রাজশাহী বুধবার, ২৮শে ফেব্রুয়ারি ২০২৪, ১৬ই ফাল্গুন ১৪৩০

গরু চরিয়ে-রিকশা চালিয়ে সন্তানদের বানালেন বিসিএস ক্যাডার


প্রকাশিত:
৭ আগস্ট ২০২৩ ০৭:৫৮

আপডেট:
৮ আগস্ট ২০২৩ ০৫:১৩

ফাইল ছবি

রাজশাহীর দুর্গাপুর উপজেলার পানানগর ইউনিয়নের গুনাজিপাড়া গ্রামের সন্তোষ চন্দ্র মন্ডল। পেশায় গরুর রাখাল, তবুও অদম্য মেধাবী দুই মেয়ের পড়াশোনার খরচ জোগাতে পিছু হটেননি এই বাবা। পৈত্রিক সূত্রে পাওয়া পৌনে দুই বিঘা জমির মধ্যে বাড়ির ভিটার ৮ শতাংশ ছাড়া সবই বিক্রি করেছেন সন্তানদের জন্য। মেয়েদের লেখাপড়ায় মেয়েদের অদম্য ইচ্ছা শক্তি দেখে বরণ করেছেন হাজারো দুঃখ-কষ্ট। তবে তার সেই দুঃখ আর কষ্টের যেন অবসান হতে চলেছে। 

কেননা বড় মেয়ে রত্না রানী মন্ডল ৪১তম বিসিএস পরীক্ষায় ভেটেরিনারি সার্জন ক্যাডারে সুপারিশপ্রাপ্ত হয়েছেন। ঘাম ঝড়িয়ে কষ্টার্জিত অর্থের যেন সঠিক মূল্যই দিতে চলেছেন সন্তানরা। ছোট মেয়ে রাখি রানী মন্ডলও রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে সম্প্রতি স্নাতক ও স্নাতকোত্তর শেষ করেছেন। দীর্ঘ পরিশ্রম স্বার্থক হওয়ায় আবেগাপ্লুত বাবা সন্তোষ চন্দ্র মন্ডল।

এদিকে, একই উপজেলার জয়নগর ইউনিয়নের চুনিয়াপাড়া গ্রামের হতদরিদ্র রিকশাচালক আকতার আলী। আড়াই শতক জমির ওপর টিনের ছাউনি দিয়ে তৈরি দুইটা ঘরই যেন শেষ সম্বল। তবুও রিকশা চালিয়েই দুই ছেলে-মেয়েকে লেখাপড়া করিয়েছেন পরিশ্রমী বাবা। নিজে দুঃখ-কষ্ট নিরবে বয়ে বেরিয়েও সন্তানদের মানুষ করতে ছুটেছেন হাসিমুখে। স্বপ্ন দেখেছেন হয়তো কষ্টগুলো একদিন ঘুঁচে যাবে।

আশার বীজ বুনেছেন, প্রাণ খুলে হাসবেন আর সকলের প্রশংসায় ভাসবেন। অবশেষে সেই স্বপ্ন যেন আজ পরিশ্রমী বাবার হাতের মুঠোয় ধরা দিয়েছে! কেননা তার বড় ছেলে জিল্লুর রহমান ৪১তম বিসিএস পরীক্ষায় শিক্ষা ক্যাডারে সুপারিশপ্রাপ্ত হয়েছেন। রিকশাচালক থেকে বিসিএস ক্যাডারের বাবা আকতার। শত কষ্টের অবসান ঘটিয়ে ঈদের চাঁদ হয়ে ধরা দিয়েছে এই খুশির সংবাদ।


জানা যায়, রাখাল সন্তোষ চন্দ্র মন্ডলের বড় মেয়ে রত্না রানী মন্ডল। ময়মনসিংহ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ভেটেরিনারি সায়েন্স অ্যান্ড অ্যানিমেল হাজবেন্ড্রি বিভাগে পড়াশুনা করেছেন রত্না। তিনি সম্প্রতি প্রকাশিত ৪১তম বিসিএস পরীক্ষার ফলে ভেটেরিনারি সার্জন ক্যাডারে নিয়োগের জন্য সুপারিশপ্রাপ্ত হয়েছেন। এর আগে গত জানুয়ারিতে উপজেলার গোলাবাড়ী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে সহকারী শিক্ষক হিসেবে নিয়োগ পান তিনি। তার ছোট বোন রাখি রানী মন্ডল রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের জেনেটিক্স বিভাগ থেকে সদ্য স্নাতক ও স্নাতকোত্তর শেষ করেছেন।

মেয়ে বিসিএস ক্যাডার হওয়ার খবরে কান্নায় আবেগআপ্পুত হয়ে যান রাখাল বাবা সন্তোষ চন্দ আনন্দ। উচ্ছ্বসিত কণ্ঠে তিনি বলেন, পেশায় আমি একজন গরুর রাখাল। তবুও আজ আমি পৃথিবীর সবচেয়ে সফল বাবা। আমি আজ অনেক খুশি ও আনন্দিত। আমি দরিদ্র হওয়া সত্বেও সন্তানদের প্রতি আমি দায়িত্ব ও কর্তব্য সঠিকভাবে পালন করতে পেরেছি বিধায় আমার সন্তানের এই সফলতা।

প্রতিবেশী ও উপজেলা মুক্তিযোদ্ধা সন্তান কমান্ডের সদস্য সচিব বিধান সরকার জানান, গরুর রাখাল সন্তোষ চন্দ্র মন্ডলের বাবার রেখে যাওয়া পৌনে দুই বিঘা জমি ছিল। দুই মেয়ের পড়ালেখার খরচ চালাতে গিয়ে সেগুলোর প্রায় সবই বিক্রি করেছেন। বর্তমানে তিনটি দুধের গাভী ছাড়া কিছুই নেই তার। নিজেই রাখাল হয়ে গরু লালন পালন করেন তিনি। তার মেধাবী মেয়ে রত্না রানী মন্ডল গত জানুয়ারিতে দুর্গাপুর উপজেলার গোলাবাড়ী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে সহকারী শিক্ষক হিসেবে যোগদান করে। বিদ্যালয়ে কর্মরত অবস্থায় তিনি ৪১তম বিসিএস পরীক্ষায় অংশ নিয়ে ভেটেরিনারি সার্জন ক্যাডারে চূড়ান্তভাবে সুপারিশপ্রাপ্ত হয়েছেন। আমরা এলাকাবাসী হিসেবে খুবই আনন্দিত।

বিসিএস ক্যাডারে সুপারিশপ্রাপ্ত রত্না রানী মন্ডল বলেন, আমার পরিবার দরিদ্র হওয়া সত্বেও আমার বাবা-মায়ের অনুপ্রেরণায় আজ আমি সফল হয়েছি। বাবা-মাকে নিয়ে আমি গর্বিত। ইচ্ছাশক্তি ও নিয়মিত অধ্যাবসায়ই আমার সফলতার মূল চাবিকাঠি।

আর হত দরিদ্র রিকশাচালক আকতার আলীর বড় ছেলে জিল্লুর রহমান। তিনি রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় (রাবি) থেকে ম্যানেজমেন্ট স্টাডিজ বিভাগ থেকে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর শেষ করেন। সম্প্রতি প্রকাশিত ৪১তম বিসিএস পরীক্ষার ফলে শিক্ষা ক্যাডারে নিয়োগের জন্য সুপারিশপ্রাপ্ত হয়েছেন তিনি। চলতি বছরের জানুয়ারিতে উপজেলার শ্রীধরপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে সহকারী শিক্ষক পদে নিয়োগ পান তিনি। তার ছোট বোন জুলেখা খাতুন রাজশাহী কলেজের অর্থনীতি বিভাগে স্নাতকোত্তরে অধ্যয়নরত আছেন।

শিক্ষা ক্যাডার জিল্লুর রহমানের বাবা আকতার আলী বলেন, টিনের চালার বাড়িটি ছাড়া আর কিছুই নেই আমার। দুই সন্তানের পড়ালেখা ও পরিবারের খরচ চালাতে নিজ গ্রামে কৃষিশ্রমিক ও দিনমজুরি করতে হয়। বড় সন্তান জিল্লুর রহমান হাটকানপাড়া ডিগ্রী কলেজ থেকে এইচএসসি পাশ করলে তাকে বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির জন্য শহরে কোচিংয়ে ভর্তি করেছিলাম। শহরে প্রতিদিন কোচিংয়ে যাতায়াত খরচ চালাতে কষ্টসাধ্য হয়ে উঠলে একটি বাসা ভাড়া নিয়ে পরিবার নিয়ে রাজশাহী শহরে চলে আসি।

সেখানে মহাজনদের কাছ থেকে ভাড়ায় রিকশা নিয়ে দিনরাত রিকশা চালিয়ে ছেলে-মেয়ের পড়ালেখার খরচসহ সংসার চালিয়েছি। মেধাবী জিল্লুর রহমান রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে ব্যবস্থাপনা বিষয়ে ভর্তির সুযোগ পায়। বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হয়ে সে পড়ালেখার পাশাপাশি টিউশনি করে পরিবারের খরচে সহযোগিতা করতো। ২০১৭ সালে মাস্টার্স শেষ হলে সে সরকারি চাকরির জন্য আবেদন করার পাশাপাশি বিসিএসের জন্য নিয়মিত পড়াশুনা চালিয়েছে।

তিনি আরও বলেন, জিল্লুর ২০২৩ সালের জানুয়ারিতে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক পদে নিয়োগ পেলে দুর্গাপুর উপজেলা শ্রীধরপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে জানুয়ারি মাসে যোগদান করে। এরপর ৪১তম বিসিএসের চূড়ান্ত পরীক্ষায়ও শিক্ষা ক্যাডারে সুপারিশ পেল।

ছেলে বিসিএস ক্যাডার হওয়ায় আনন্দ প্রকাশ করতে গিয়ে রিকশাচালক বাবা বলেন, আজ আমার ছেলে বিসিএস ক্যাডার হওয়ার পেছনে গ্রাম ও এলাকাবাসীর অবদান সবচেয়ে বেশি। কারণ মেধাবী ছেলে জিল্লুর রহমান যেন ঝরে না যায় সেজন্য এলাকার বিত্তবানরা শুরুতে অর্থনৈতিকভাবে নানা সহযোগিতা করেছেন। এছাড়া ছেলে-মেয়ের পড়ালেখার খরচ চালাতে ১৫ বছর ধরে রাজশাহী শহরে রিকশা চালিয়েছি। আমার কষ্টের অর্জন হিসেবে আজ আমার ছেলে বিসিএস ক্যাডার হয়েছে। এতে আমি সবচেয়ে খুশি ও আনন্দিত। ছেলের মতো মেয়েকেও বিসিএস ক্যাডার হিসেবে দেখার আশা প্রকাশ করেন তিনি।

বিসিএস ক্যাডারে সুপারিশপ্রাপ্ত জিল্লুর রহমান বলেন, আমি হতদরিদ্র পরিবারের সন্তান। আমার বাবা রিকশা চালিয়ে আমাকে বিসিএস ক্যাডার বানিয়েছে এটা আমার গর্ব। ভবিষ্যতে আমিও দরিদ্র মেধাবীদের পাশে দাঁড়াতে চাই।

এ বিষয়ে দুর্গাপুর উপজেলা নির্বাহী অফিসার সোহেল রানা বলেন, এটা অবশ্যই দুর্গাপুরবাসীর গর্বের বিষয়। তাদের দেখে অন্যরাও উৎসাহিত হবে। তাদেরকে উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে অভিনন্দন জানাই। তাদের জন্য অনেক শুভ কামনা। তারা যেন প্রকৃত সিভিল সার্ভেন্ট হয়ে দেশের জন্য সেবা করতে পারে সে কামনাও করেন এই কর্মকর্তা।

 

 

আরপি/এসআর



আপনার মূল্যবান মতামত দিন:

Top