রাজশাহী মঙ্গলবার, ২৫শে জুন ২০২৪, ১২ই আষাঢ় ১৪৩১

তীব্র থেকে তীব্রতর হচ্ছে পানি সংকট, নামছে পানির স্তরও


প্রকাশিত:
২৩ মার্চ ২০২৩ ০৬:০৭

আপডেট:
২৫ জুন ২০২৪ ১৫:৩৮

ফাইল ছবি

শহর, নগর, বন্দর কিংবা শুধু গ্রামীন জনপদেই নয়, পানির প্রয়োজনীয়তা এখন সর্বত্রই। প্রাণের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখতে পানির ব্যবহার অতীব জরুরী। কিন্তু অনিয়ন্তিত পানির অপচয়, মাত্রাতিরিক্ত ভূগর্ভস্থ পানির ব্যবহার ও সংকট উত্তরণে কার্যকরী পদক্ষেপ গ্রহণে অনীহার ফলে তীব্র থেকে তীব্রতর হতে পারে পানি সংকট। 

বিশেষ করে বরেন্দ্র অঞ্চলের আবাদি জমিতে লাগামহীন গভীর নলকূপ স্থাপন যেমন হুমকি বাড়িয়েই চলেছে, তেমনি পিছিয়ে নেই যত্রতত্র সাবমারসিবল পাম্পে পানি উত্তোলনও। ফলে একদিকে যেমন কমছে বৃষ্টিপাত, ভারসাম্য হারাতে বসেছে পরিবেশ-প্রকৃতিও। সংকট মোকাবেলায় ভূগর্ভস্থ ও ভূউপরিস্থ পানি ব্যবহারে সমন্বিত উদ্যোগ না থাকায় হুমকির সম্মুখীন হচ্ছেন বরেন্দ্রসহ পুরো দেশের জনগোষ্ঠী।

জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরের মতে, দেশে দৈনিক ২৭ লাখ ৫০ হাজার লিটার পানির চাহিদা রয়েছে। যার ৮০ শতাংশই মেটানো হয় ভূগর্ভস্থ উৎস থেকে পানি উত্তোলনের মাধ্যমে। আর মাটির ওপরের উৎস থেকে মেটানো হয় বাকি পানির চাহিদা। সত্তরের দশকে প্রথম গভীর টিউবওয়েল বসানোর কাজ শুরু হয় বাংলাদেশে। সে সময় মাত্র ৫০ ফুট গভীরেই মিলতো পানি। একই টিউবওয়েলে বর্তমানে ১৬০ ফুট গভীরে গিয়েও মিলছে না পর্যাপ্ত পরিমাণে পানি।

তবে অনিয়ন্ত্রিত ব্যবহার ও প্রাকৃতিক দূষণের প্রভাবেই এমনটা হচ্ছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। তাদের দাবি, বরেন্দ্র অঞ্চলের জায়গা বিশেষে ১০ ফুট থেকে ৩০ ফুট পর্যন্ত নিচে নেমে গেছে ভূগর্ভস্থ পানির স্তর। বর্ষা মৌসুমেও স্বাভাবিক অবস্থায় আসছে না পানির স্তর। পানির স্তর নেমে যাওয়া অব্যাহত থাকলে ২০ থেকে ৩০ বছরের মধ্যে এই অঞ্চলে পানির সংকট তীব্র থেকে তীব্রতর হওয়ার শঙ্কাও রয়েছে বহুগুণ। ইতোমধ্যে পানির অভাবে ফসলের আবাদ বন্ধ হয়ে যেতে বসেছে বরেন্দ্র এলাকার অনেক উপজেলায়। চাষাবাদের ক্ষেত্রে ফসলের পরিবর্তন আনতেও বাধ্য হয়েছেন অনেক কৃষক।

এ বিষয়ে জানতে বাংলাদেশ পরিবেশ আইনবিদ সমিতি (বেলা) রাজশাহীর সমন্বয়কারী তন্ময় কুমার সান্যালের সাথে কথা হয় প্রতিবেদকের। তিনি বলেন, বরেন্দ্র অঞ্চলের গত ৫০ বছরের ইতিহাস বিশ্লেষণ করে দেখা যায় ভূগর্ভস্থ পানির স্তর উত্তরোত্তর নিচের দিকেই যাচ্ছে। এর পেছনে কয়েকটি কারণ রয়েছে। বিশেষ করে রাজশাহী ও রংপুর বিভাগে প্রাকৃতিকভাবে বৃষ্টির পরিমাণ পূর্বের চেয়ে অনেক কমে গেছে, যা উল্লেখযোগ্য একটি কারণ। এছাড়াও বিএমডিএ গত ৩০ বছরে ভূগর্ভস্ত যে পরিমাণ পানি উত্তোলন করেছে সেটাও বৈজ্ঞানিকভাবে চিন্ত করে করেছে বলে মনে হয় না।

তিনি আরও বলেন, শুধু বিএমডিএ-ই না, উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলে প্রচুর কৃষক স্যালোমেশিন দিয়ে ভূগর্ভস্ত পানি উত্তোলন করে থাকে। আবার সাম্প্রতিক সময়ে বাংলার ঘরে ঘরে সাবমারসিবল পাম্প নতুন উৎপাত তৈরি করেছে। এসব মানব সৃষ্ট ও প্রাকৃতিক কারণেই ভূগর্ভস্ত পানিন স্তর আশংকাজনক হারে নিচে নেমে যাচ্ছে। তবে সমস্যা যেহেতু আছে সমাধানের জন্যও যদি চিন্তা করা যায় তাহলে প্রথমেই উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলে ভূগর্ভস্ত পানি নিয়ে একটা গবেষণা হওয়া উচিত।

গবেষণায় প্রাপ্ত ফলাফল অনুযায়ী সারাদেশে না হলেও উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলের জন্য একটি সমন্বিত পানি ব্যবস্থা অবশ্যই হওয়া উচিত। সমন্বিত পানি ব্যবস্থা মানে আইন থাকবে, সেই অনুযায়ী কার কতটুকু পানি দরকার, কখন দরকার, কিভাবে তোলা হবে, ভূগর্ভস্ত বা ভূউপরিস্থ পানির সমস্যা কিভাবে দূর করা হবে সেটা বলা থাকবে। যেখানে ভূগর্ভস্ত পানি কিভাবে ব্যবহার করবো-কোথায় পাবো, আবার ভূউপরিস্থ পানি কিভাবে ব্যবহার করবো-কোথায় থেকে নিবো সেটাও স্পষ্ট থাকবে বলে উল্লেখ করেন তিনি।

এর পাশাপাশি শহরাঞ্চলে পৌরসভা বা সিটি করপোরেশনের মাধ্যমে মানুষের বাড়ি বাড়ি যে পানি সরবরাহ করে থাকি সেই ব্যবস্থাগুলোর বিষয়েও নজর দেওয়া উচিত। আগামী দিনে আমরা শুধু ভূগর্ভস্থ পানি থেকেই এগুলো করবো নাকি ভূউপরিস্থ পানির ব্যবহার নিশ্চিত করবো সেটাও ভাবা উচিত। এসব বিষয় নিয়ে কাজ করতে পারলেই উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলে ভূগর্ভস্ত পানির যে সমস্যা আগামী দিনে কিছুটা সমাধান হতে পারে বলেও মনে করেন এই আইনবিদ।

ভূগর্ভস্থ পানির স্তর নিচে নামা প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ভূগর্ভস্থ পানির স্তর নিচে নামার সঠিক তথ্যটা নেই। তবে বছর দুয়েক আগে বিএমডিএ তারও ১০ বছর আগের একটা পরিসংখ্যান দিয়েছিল। সেখানে তুলনা করে দেখা যায়, বিভিন্ন জায়গায় ভূগর্ভস্থ পানির স্তর ১০ ফুট থেকে ৩০ ফুট পর্যন্ত নিচে নেমে গেছে। এভাবে যদি চলতে থাকে তবে শীঘ্রই বড় হুমকির সম্মুখীন হওয়া লাগতে পারে।

রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূতত্ত্ব ও খনিবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক ও পানি বিশেষজ্ঞ চৌধুরী সারওয়ার জাহান বলেন, এই এলাকায় বৃষ্টিপাত যেমন কমেছে তেমনিভাবে কৃষি কাজে পানির ব্যবহারও বেড়েছে। আর বৃষ্টিপাতের মাধ্যমে রিসাইকেল প্রক্রিয়াও কমে গেছে, চাহিদা অনুযায়ী সেটা পূরণ করতে পারছে না। যার ফলে পানির ন্তর নেমে যাচ্ছে। সব মিলিয়ে এলাকায় খাদ্য নিরাপত্তার জন্য যে চাহিদা ও মানুষের জীবন-জীবিকার জন্য যে চাহিদা সেটা হুমকির সম্মুখীন হচ্ছে।

তিনি বলেন, আমাদের পানি উত্তোলনটা বেশি। বৃষ্টিপাতের সাথে পানি উত্তোলনের একটা সম্পর্ক আছে। পানি উত্তোলনের হার এতো বেশি যেটা বৃষ্টিপাত দিয়ে কভার দেওয়া সম্ভব না। যদি সময়োপযোগী ব্যবস্থা না গ্রহণ করা যায় তাহলে সামনে ২০-৩০ বছরে এই অঞ্চলে একটা ধ্বস নামতে পারে।

ব্যবস্থার মধ্যে বৃষ্টির পানি সংর‌ক্ষণ প্রক্রিয়াটিও হতে পারে, যেটি মাননীয় প্রধানমন্ত্রীও বলেছেন। বাংলাদেশ পানি বিধি ২০১৮ তে ওই কথাগুলোই বলা আছে, সেগুলোর প্রয়োগ খুব জরুরী ভিত্তিতে করা দরকার। এটি বাস্তবায়নে সরকারকেও যত্নবান হতে হবে বলে মনে করেন পানি বিশেষজ্ঞ।

এদিকে বিএমডিএ’র সম্প্রতি এক হিসাব অনুসারে বরেন্দ্র অঞ্চলের বার্ষিক ভূগর্ভস্থ পানি উত্তোলনের পরিমাণ ১৩ হাজার ৭১০ মিলিয়ন ঘনমিটার। যার প্রায় ৭০ শতাংশই বেসরকারি গভীর নলকূপ দিয়ে উত্তোলিত হচ্ছে। প্রকৌশলীদের হিসাব অনুযায়ী, এই পরিমাণ পানি এক বিঘা আয়তনের দুই মিটার গভীরতা বিশিষ্ট ১৮ লাখ পুকুর ভরে ফেলার জন্য যথেষ্ট।

জানতে চাইলে বরেন্দ্র বহুমুখী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (বিএমডিএ) নির্বাহী পরিচালক প্রকৌশলী আবদুর রশিদ বলেন, বিএমডিএ‘র পক্ষ থেকে ইতোমধ্যে গভীর নলকূপ স্থাপন বন্ধ ঘোষণা করা হয়েছে। বরেন্দ্র এলাকা দিয়ে যাওয়া পদ্মা, মহানন্দা ও আত্রাই নদীর সহায়তায় সারফেস ওয়াটার (ভূউপরিস্থ পানি) ব্যবহারের ব্যাপারে বলা হচ্ছে। এসব নদী থেকে আন্ডারগ্রাউন্ড পাইপলাইনের মাধ্যমে উঁচু বরেন্দ্র জমিতে পানি নিয়ে যাওয়ারও ব্যবস্থা করা হচ্ছে।

তিনি আরও বলেন, বরেন্দ্র এলাকার পুকুর ও খাল সংস্কার করে বৃষ্টির পানি ধারণের উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। পাশাপাশি কৃষকদের অধিক পানির ফসল থেকে কম পানিতে আবাদের প্রতি আগ্রহী করে তোলা হচ্ছে। তবে পানির ব্যবহার কমাতে হবে, এজন্য কৃষকদের মাঝে আরও জনসচেতনতা সৃষ্টি করা দরকার।

এছাড়া পানি দেওয়ার ক্ষেত্রে প্রি-পেইড সিস্টেম চালুর ফলে কিছুটা পানি সাশ্রয় করা সম্ভব হচ্ছে। কৃষকরা অতিরিক্ত পানি ব্যবহার কমিয়ে পরিমিত ব্যবহারের দিকে ঝুঁকছে বলেও মনে করেন প্রকৌশলী।

 

 

আরপি/এসআর



আপনার মূল্যবান মতামত দিন:

Top