রাজশাহী মঙ্গলবার, ১৬ই জুলাই ২০২৪, ২রা শ্রাবণ ১৪৩১

কৃষিতে স্বাবলম্বী হচ্ছেন রাজশাহীর গ্রামীণ নারীরা


প্রকাশিত:
৯ ফেব্রুয়ারি ২০২৩ ১০:২৮

আপডেট:
১৬ জুলাই ২০২৪ ১৪:৩৫

ছবি: সংগৃহীত

বাংলাদেশের কৃষি অর্থনীতিতে নারীর অংশগ্রহণ ও অবদান ক্রমে বাড়লেও এর সঠিক মূল্যায়ন ও স্বীকৃতি পাচ্ছে না বলে নারীদের আক্ষেপ থেকেই যাচ্ছে। নারীর অধিকার বিষয়ে কাজ করে এমন সংস্থাগুলোর অভিযোগ- নারী দিবস এলেই নারীর অবদান ও নিরাপত্তার বিষয়গুলো নিয়ে ব্যাপক আলোচনা হলেও পরে আর এর রেশ থাকে না।

বাংলাদেশের উন্নয়নের ক্ষেত্রে কৃষিকে যেমন উপেক্ষা করা যায় না, তেমনি কৃষিক্ষেত্রে নারীর অবদানকেও অস্বীকার করার কোনো সুযোগ নেই। দেশের বিভিন্ন স্থানে অর্থনৈতিকভাবে স্বাবলম্বী হওয়ার প্রমাণ দিয়েছেন নারীরা। ব্যতিক্রম নয় রাজশাহীর বাঘা উপজেলার গ্রামীণ নারীরা। অর্থনৈতিকভাবে স্বাবলম্বী হওয়ার লক্ষ্যে কৃষি ও ক্ষুদ্র শিল্প খাতে পুরুষের পাশাপাশি গ্রামীণ নারীরা অগ্রণী ভূমিকা রেখে চলেছে। সীমান্তবর্তী উপজেলা হওয়ায় অত্র অঞ্চলে শিল্প প্রতিষ্ঠান তেমন একটা গড়ে উঠেনি। তবে হাতে গোনা যে দু’একটি প্রতিষ্ঠান রয়েছে সেখানে রাত-দিন সমানে কাজ করে যাচ্ছে নারীরা। এর ফলে তারা আর্থিকভাবে স্বাবলম্বী হচ্ছেন।

স্থানীয়রা জানান, এ অঞ্চলের দরিদ্র শ্রেণির নারী এবং উপজাতীয় মেয়েরা কৃষি প্রকল্প যেমন- ধান, পাট, গম, আলু, পেঁয়াজ, রসুন, মসুর, সরিষা, হলুদ, বরই ইত্যাদি ফসল উৎপাদনে পেটে-পিঠে সন্তান বহন করে সাফল্যের সাথে কাজ করে যাচ্ছে। এ ক্ষেত্রে গৃহস্থ ঘরের বধূরা খেতে-খামারে কাজ না করলেও ঘরে বসে ওই সমস্ত ফসলের সকল কাজই তারা করছেন।

সৃষ্টির আদিকাল থেকে আজ পর্যন্ত সন্তান জন্ম দেয়া, গৃহশয্যা, ফসল উৎপাদন-সহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে নারীরাই ব্যাপক ভূমিকা রেখে চলেছে। প্রাচীনকালে নারীরাই কেবল কৃষিকাজ করতো। এখন তা বিভক্ত হয়ে গেছে নারী-পুরুষে। এদিক থেকে বাঘার নারীরা ভিন্ন কিছু নয়।

আদি সমাজের মেয়েদের মতো এ অঞ্চলের দরিদ্র ও উপজাতীয় মেয়েরা প্রচুর পরিশ্রম করে খাদ্য উৎপাদন ও তা রক্ষার নিমিত্তে মাঠে, ঘাটে কল কারখানায় কাজ করে চলেছে। বিশেষ করে ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠির লোকেরা সন্তান-কাঁধে ঝুলিয়ে অনেক শক্ত কাজ করছে। কৃষি ক্ষেত্রে এসব এলাকার গৃহস্থ ঘরের মেয়েরা যে বসে আছে তাও নয়, তারা ঘরে বসে ফসল মাড়ায়, শুকানো, নিড়ানো প্রভৃতি কাজে সহায়তা দিয়ে যাচ্ছে।

কথা হয় বাঘা উপজেলার আমোদপুর গ্রামের নারী শ্রমিক হাসিনা খাতুনের সাথে। তিনি বলেন, আমাদের জমি-জমা না থাকায় নিজেদের কর্মসংস্থানের কোন ব্যবস্থা নাই। এ কারণে বাধ্য হয়ে অন্যের কৃষি কাজ করে সংসার চালায়।

একই এলাকার অপর এক নারী শ্রমিক রোকেয়া বেগম বলেন, আমাদের ২ বিঘা নিজের জমিতে ফসল উৎপাদন করতে কৃষি শ্রমিকের পারিশ্রমিক দেয়ার মতো সামর্থ না থাকায় আমার স্বামীর কাজে সাহায্য করি।

নারীদের স্বাবলম্বী করে গড়ে তোলার লক্ষে বাঘার নারায়ণপুর গ্রামে অবস্থিত ‘আশার আলো’ নামের একটি প্রতিষ্ঠানের নারী উদ্যোক্তা ফাতেমা মাসুদ লতা। তিনি প্রধানমন্ত্রীর হাত থেকে স্বর্ণ পদকও পেয়েছেন। তার অধীনে কাজ করছেন শতাধিক নারী।

এ দিকে উপজেলার মীরগঞ্জে ব্রিটিশ আমলে গড়ে ওঠা সেরিকালচারে (রেশম শিল্প) নারী পুরুষ সমানে উৎপাদনমুখী কাজ করে চলেছে। এখানে কোন পোশাক তৈরি না হলেও তাদের উৎপাদিত পলু পোকার সৃষ্ঠ গুটি চলে যাচ্ছে বিভাগীয় শহর রাজশাহীর সিল্ক কারখানায়। তৈরি হচ্ছে ঐতিহ্যবাহী রাজশাহী সিল্ক শাড়িসহ নানা রকমের পোশাক। আর এসব ক্ষেত্রে অত্র অঞ্চলের গ্রামীণ নারীদের ভূমিকাই অগ্রগণ্য।

কৃষি বিশেষজ্ঞদের মতে, অবৈতনিক পারিবারিক কাজের পাশাপাশি ৭৭ শতাংশ গ্রামীণ নারী কৃষি-সংক্রান্ত কাজে নিয়োজিত। নারীরাও কৃষক, তারাও কৃষিকাজ করেন।

রাজশাহী কৃষি সম্প্রসারণ বিভাগের উপপরিচালক কৃষিবিদ মোজদার হোসেন বলেন, এ অঞ্চলের নারীরা শুধু কৃষিতেই নয়, ক্ষুদ্র কুঠির শিল্পেও তাদের প্রচুর অবদান রয়েছে। যেমন, সেরিকালচার প্রকল্পে পলুপোকা উৎপাদন ও সংরক্ষণ, এছাড়াও মৃত ও হস্থ শিল্পে গ্রামীণ নারীদের একক ভূমিকা লক্ষ্য করা যায়। বর্তমানে অত্র অঞ্চলের নারীদের গড়া হস্তশিল্পের নানা পণ্য যেমন, নকশী কাঁথা, সূচি কর্ম, সেলাই ফোড়া, শাড়ি-পাঞ্জাবিসহ বিবিধ শিল্পের কাজ রাজধানী ঢাকা শহরের সুনাম খ্যাত আড়ং সহ দেশের বিভিন্ন মার্কেটে বিক্রি হচ্ছে।

এক কথায় আর্থসামাজিক অবস্থার পরিবর্তনের লক্ষে অত্র অঞ্চলের দরিদ্র শ্রেণির নারীরা পুরুষের পাশাপাশি কাজের সন্ধানে ছুটে চলেছে কৃষি থেকে শিল্প,বাসা-বাড়ি এমনকি কল কারখানা পর্যন্ত। তারা কাজের ক্ষেত্রে কোন কিছুকেই তোয়াক্কা করছে না। বেরিয়ে আসছে খোলা আকাশের নিচে। এর ফলে স্বাবলম্বী হচ্ছে তাদের পরিবার।

 

আরপি/ এমএএইচ



আপনার মূল্যবান মতামত দিন:

Top