রাজশাহী বুধবার, ২০শে অক্টোবর ২০২১, ৬ই কার্তিক ১৪২৮


স্বল্পমেয়াদী বিনা ধান-১৭ চাষে আগ্রহ বাড়ছে নওগাঁর কৃষকদের


প্রকাশিত:
১৩ অক্টোবর ২০২১ ১৯:২৮

আপডেট:
২০ অক্টোবর ২০২১ ২৩:৩৮

ছবি: প্রতিনিধি

স্বল্প খরচ, কম সময়ে অধিক উৎপাদন, সার-পানি সাশ্রয়ী, আলোক সংবেদনশীল, উন্নত গুনাগুন সম্পন্ন ও খরাসহিষ্ণু হওয়ায় নওগাঁ জেলার কৃষকের মাঝে আশা জাগিয়েছে আমন মৌসুমে বিনা ধান-১৭ চাষে।

এছাড়া অন্য জাতের ধানের চেয়ে ১মাস আগেই ধান কাটার উপযোগী হওয়ায় এ জাতের ধান চাষে আগ্রহ বাড়ছে জেলায়।

আর এ জাতের ধানের আবাদে কৃষকদের উদ্ভদ্ধ ও সহায়তা করে যাচ্ছেন বাংলাদেশ পরমাণু কৃষি গবেষণা ইনষ্টিটিউট (বিনা) এর উপকেন্দ্র চাঁপাইনবাবগঞ্জ ও জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর খামার বাড়ি নওগাঁ।

জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্যমতে, নওগাঁ জেলায় চলতি মৌসুমে ১ লাখ ৯৭ হাজার ১১০ হেক্টর জমিতে আমনের আবাদ হয়েছে।

এর মধ্যে বিনা-১৭ জাতের ধান ১ হাজার ৩০ হেক্টর জমিতে আবাদ হয়েছে। এর মধ্যে রানীনগরে ৫২০ হেক্টর, ধামইরহাটে ১২৫ হেক্টর, নিয়ামতপুরে ৫ হেক্টর ও মান্দা উপজেরায় ২০ হেক্টরসহ অন্যান্য উপজেলায় আংশিক আবাদ হয়েছে।

বিনা-১৭ জাতের ধানে পানি কম লাগার কারনে একে গ্রীণ সুপার রাইস নামেও অবহিত করেছেন অনেকে। এ জাতের ধানে ইউরিয়া সার এক-তৃতীয়াংশ ও সেচ ৫০ শতাংশ কম লাগে।

ধানের জীবনকাল ১১০-১১৫দিন। এর প্রতি শীষে ২০০-২৫০ টি দানা থাকে এবং ফলন আশাব্যঞ্জক হওয়ায় কৃষকের জন্য এ জাতের ধান চাষ খুবই লাভজনক।

প্রতি বিঘায় প্রায় ২৬-২৭ মণ ফলন হয়ে থাকে। অন্যান্য জাতের ধানের তুলনায় বিঘা প্রতি উৎপাদন খরচ ২থেকে ৩হাজার টাকা কম হয়।

নওগাঁর নিয়ামতপুর উপজেলার শালবাড়ি গ্রামের কৃষক মো. ইব্রাহিম খলিল এই প্রথম তার ৪বিঘা জমিতে বিনা-১৭জাতের ধানের আবাদ করেছেন।

তার সাথে কথা হলে তিনি বলেন, আমি কয়েকমাস পূর্বে ইউটিউবে বিনা-১৭জাতের ধানের সুফল দেখার পর পরমাণু কৃষি গবেষণা ইনষ্টিটিউট (বিনা) এর উপকেন্দ্র চাঁপাইনবাবগঞ্জ ও নওগাঁ কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর এর সাথে যোগাযোগ করে সেখানকার কর্মকর্তাদের পরামর্শ ও সহায়তা নিয়ে আমার ৪বিঘা জমিতে বিনা-১৭ জাতের ধান রোপন করেছিলাম।

বর্তমানে ধান কাটার উপযোগী হয়েছে। আমার জমিগুলোর পাশেই স্বর্ণা -৫, তেজ ধানি গোল্ড, বিনা-৭জাতের ধানের আবাদ করেছে এখানকার কৃষকরা।

তবে তাদের ধান এখনও কাঁচা রয়েছে। আরও প্রায় ১মাসের মত সময় লাগবে তাদের রোপিত ধান কাটার উপযোগী হতে। অন্য জাতের ধান আবাদে খরচ বেশি ও ফলনও তুলনামূলক কম হওয়ায় বিনা-১৭জাতের ধানের আবাদ করতে জেলার অনেক কৃষক উদ্বৃদ্ধ হচ্ছেন।

বিনা -১৭জাতের ধান রোপনে খরচ ও লাভের বিষয়ে জানতে চাইলে ইব্রাহিম বলেন, ইউটিউব দেখে বিনা১৭ ধান চাষে আগ্রহী হয়েছি। এ জাতের ধান চাষে সেচ, সার, ঔষধ ও পানির খরচ অনেকটাই কম।

এক সাথে এ এলাকার অনেক কৃষক তাদের জমিতে ধান রোপন করলেও আমার জমির আগে ধান কাটা হচ্ছে। অন্য জাতের ধানে বিঘা প্রতি সব মিলিয়ে খচর হয় প্রায় ৮থেকে ১০হাজার টাকার মত।

কিন্তু বিনা-১৭জাতের ধানে বিঘা প্রতি ২ থেকে ৩হাজার টাকা কম খরচ হচ্ছে। ইতিমধ্যে এক বিঘা জমির ধান কাটা হয়েছে এবং ২৭মণ ধান পেয়েছি। অন্য জাতের ধানে প্রতি বিঘায় ফলন হয় সর্বোচ্চ ২০-২২মণ হারে।

এ ছাড়া ঝড় বা বৃষ্টিতে অন্য জাতের ধান জমিতে হেলে পড়ে যায়। কিন্তু বিনা-১৭জাতের ধান হেলে যায়না। কিছুদিন আগে ঝড়-বৃষ্টি হয়েছিল আমার জমির ধানের শিষ দাঁড়িয়ে ছিল।

এখন পর্যন্ত কোন সমস্যা হয়নি। আগমীতে আর বেশি পরিমাণ জমিতে এ জাতের ধানের আবাদ করবো। বর্তমানে আমার দেখাদেখি অনেকেই এখন এ জাতের ধান চাষে উদ্বৃদ্ধ হচ্ছেন।

একই উপজেলার ঘুলকুড়ি গ্রামের কৃষক মমিনুল ইসলাম রুবেল বলেন, হামরা ধানের গুনাবলির বিষয়ে সঠিকভাবে জানিনা। কৃষি অফিসের স্যারের হামাকে এলাকার কৃষকদের লিয়া মাঠ দিবস করিছে। স্যারেরা বিনা-১৭জাতের ধানের বিষয়ে অনেক পরামর্শ দিলো।

হামার পাশের জমিত ইব্রাহিম ভাই বিনা-১৭জাতের ধানের আবাদ করিছে। এই জাতের ধানের আবাদে খরচ কম, ফলনও বেশি। আর কম সময়ের মধ্যেই ধান পাকা গেছে।

এখন ইব্রাহিম ভাই ধান কাটা শুরু করিছে। আর হামাকেরে ধান পাকতে আরও ১মাসের মতন সময় লাগবে। ইব্রাহিম ভাইয়ের সাথে কথা কইয়া তার কাছ থ্যাকাও পরামর্শ লিছি।

কৃষি অফিস থ্যাকা ধানের বিজ ও সার খরচও দিবে। হামি এই ধানই আবাদ করার সিন্ধান্ত লিছি। হামার মত অনেকেই এ ধানের আবাদ করতে চাচ্ছে।

নওগাঁ জেলা কৃষি প্রশিক্ষণ কর্মকর্তা কৃষিবিদ কেএম মঞ্জুরে মওলা জানান, চলতি মৌসুমে জেলায় বিনা-১৭ জাতের ধান ১ হাজার ৩০ হেক্টর জমিতে আবাদ হয়েছে।

রোগবালাই কম, উৎপাদন খরচ তুলনামূলক কম এবং অধিক ফলন হওয়ায় জেলার কৃষকরা আগ্রহী হচ্ছেন এই জাতের ধান আবাদে।

আমরা কৃষকদের প্রয়োজনীয় বীজ ও সার সহায়তা দিবো। সেই সাথে প্রতিটি উপজেলায় কৃষকদের নিয়ে বিনা-১৭জাতের ধান চাষে উদ্বৃদ্ধ করতে মাঠ দিবস করছি।

মঙ্গলবার নওগাঁর নিয়ামতপুরে কৃষক ইব্রাহিম খলিল এর জমিতে রোপনকৃত বিনা-১৭জাতের ধান কর্তন, মাঠ দিবস ও এক আলোচনা সভা সহ আবাদ পরিদর্শনে এসেছিলেন বাংলাদেশ পরমাণু কৃষি গবেষণা ইনষ্টিটিউট (বিনা) এর চাঁপাইনবাবগঞ্জ এর উর্ধ্বতন বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ও উপকেন্দ্রের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা ড. মো. হাসানুজ্জামান।

এসময় তার সাথে কথা হলে তিনি বলেন, বিনা-১৭ একটি স্বল্পমেয়াদী জাতের ধান। খরাসহিষ্ণু (৩০ শতাংশ পানি কম প্রয়োজন)। ১১০-১১৫ দিনের মধ্যে কাটা যাবে এবং প্রতি বিঘায় ২৬-২৭মণ ধান উৎপাদন হচ্ছে।

যে জমিতে দুইটি ফসল হতো, সেখানে এ জাতের ধান চাষে এখন তিনটি ফসল সম্ভব। বিনা ধান-১৭ স্বল্প জীবনকালীন হওয়ায় ধান কাটার পর ওই একই জমিতে কৃষক সরিষা/মসুর/আলু চাষ করতে পারবেন। পরে জমি তৈরি করে বোরো ধান লাগানো যাবে।

আমরা নওগাঁ,রাজশাহী, চাঁপাইনবাবগঞ্জ ও নাটোর জেলার কৃষকদের উদ্বৃদ্ধ করতে প্রচার-প্রচারণা চালিয়ে যাচ্ছি বিনা-১৭জাতের ধান রোপন এর জন্য।

 

আরপি/এমএএইচ-০৬



আপনার মূল্যবান মতামত দিন:

Top