রাজশাহী রবিবার, ২৭শে নভেম্বর ২০২২, ১৩ই অগ্রহায়ণ ১৪২৯


নৌকাডুবিতে ৫০ লাশ উদ্ধার, আরও নিখোঁজ ২০-২৫ জন


প্রকাশিত:
২৭ সেপ্টেম্বর ২০২২ ০৯:০০

আপডেট:
২৭ নভেম্বর ২০২২ ০৪:২০

ছবি: সংগৃহীত

পঞ্চগড়ে করতোয়া নদীতে নৌকাডুবির ঘটনায় মৃত্যুর মিছিল শুধু দীর্ঘই হচ্ছে। মৃতের সংখ্যা অর্ধশতের ঘর স্পর্শ করল। সোমবার (২৬ সেপ্টেম্বর) দ্বিতীয় দিনের মতো উদ্ধার অভিযান শেষে সর্বমোট ৫০ জনের লাশ উদ্ধার করেছে ফায়ার সার্ভিসের ডুবুরি দল। এখনও ২০ থেকে ২৫ জন নিখোঁজ রয়েছেন। আগামীকাল উদ্ধার অভিযান আবার শুরু হবে।

সর্বশেষ পাওয়া তথ্য মতে, ৫০টি মৃতদেহ উদ্ধার করা হয়েছে। এর মধ্যে শিশু ১৩ জন, নারী ২৫ জন এবং পুরুষ ১২ জন। এর মধ্যে বোদার ২৯ জন, বীরগঞ্জের ১৮ জন, আটোয়ারীর একজন, পঞ্চগড় সদরের একজন এবং ঠাকুরগাঁও সদরের একজন।

সোমবার (২৬ সেপ্টেম্বর) সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত বোদায়, দেবীগঞ্জে, পাশের জেলা দিনাজপুরের খানসামা এবং বীরগঞ্জ থেকে মরদেহগুলো উদ্ধার করা হয়।

জেলা প্রশাসন, বোদা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) সুজয় কুমার রায়, দেবীগঞ্জ থানার ডিউটি অফিসার সোহেল রানা ও খানসামা থানার ওসি চিত্তরঞ্জন এসব তথ্য নিশ্চিত করেন।

বোদা উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) মো. ইমরানুজ্জামান বলেন, এখন পর্যন্ত ৫০টি মৃতদেহ উদ্ধার করা হয়েছে। এখনও ২০-২৫ জন নিখোঁজ রয়েছেন। তাদের উদ্ধারে অভিযান অব্যাহত থাকবে।

ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সের উদ্ধারকারী দল ঘটনাস্থলে অবস্থান করছে। আগামীকাল মঙ্গলবার সকাল থেকে তারা আবার উদ্ধারকাজ শুরু করবে।

এদিকে স্থানীয়রা উদ্ধার অভিযান নিয়ে ফায়ার সার্ভিসের ওপর ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন। তাদের দাবি, উদ্ধার কাজে ফায়ার সার্ভিসের কোনো তৎপরতা নেই, উদ্ধার কাজ করছে সাধারণ মানুষ। তাদের অভিযোগ, ফায়ার সার্ভিসের কর্মীদের বারবার বলার পরও কেউ নামছে না পানিতে। লাশ থাকার কথা বললেও স্থানীয়দের পানিতে নামতে বলেছেন বলেও অভিযোগ করেন তারা।

স্থানীয় কয়েকজনের সাথে কথা বলে জানা যায়, সোমবার (২৬ সেপ্টেম্বর) সকাল থেকে প্রতিটি লাশ উদ্ধার করেছে সাধারণ মানুষ। উদ্ধারের পর ফায়ার সার্ভিস এসে তাদের নামে গণমাধ্যমে প্রচার করছে।

বীরেন্দ্র নাথ নামে একজন বলেন, ‘এখানে ফায়ার সার্ভিস খালি মহড়া দিতে আসছে। নৌকায় করে একিনারা-ওকিনারা ঘুরে বেড়াচ্ছে, তারা কী কাজ করতেছে? মানুষ গুলা হামরা এখানে আছি, লাশটা অন্তত পাইলে বাড়ি নিয়ে যামো, আর এরা তামাশা লাগাইছে।’

ষাটোর্ধ শরীফ উদ্দিন বলেন, ‘সকাল থাকি দেখনু কেউ নামে নাই পানিতে। এলাকার মানুষ লাশ গুলা তুলি আনেছে। আর হাকাও সরকার বেতন দেয় ফায়ার সার্ভিসের লোককে।’

বিমল চন্দ্র বলেন, ‘এরা নাটক করতেছেন, কোন কাজ নাই। সকাল থেকে শুধু ঘুরে বেরাচ্ছে৷ আর ডজনে ডজনে গাড়ি আনি রাখছে লোক নাই।’

পরিমল সরকার বলেন, ‘মানুষ জন খুব ক্ষেপছে এদের কার্যকলাপ দেখে। আমাদের পরিবারের পাঁচজন দুর্ঘটনার শিকার। তিনজনের মরদেহ পাওয়া গেছে, কিন্তু বাকিদের এখনও পাওয়া যায়নি। ফায়ার সার্ভিস শুধু নৌকা দিয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছে। একবারও দেখলাম না পানিতে নামতে। এভাবে কি উদ্ধার কাজ হয়, নাকি নাটক হয়।

তবে অভিযোগ অস্বীকার করে পঞ্চগড় ফায়ার সার্ভিস অ্যান্ড সিভিল ডিফেন্সের সহকারী পরিচালক মাহবুল ইসলাম বলেন, ‘আমাদের উদ্ধার কাজ চলমান আছে। স্বজনরা তো অভিযোগ করবেই, কারণ তাদের স্বজন হারিয়েছে। তারা লাশটা পেলে অন্তত মনকে সান্ত্বনা দিয়ে চলে যাবে। তাদের অভিযোগ ভিত্তিহীন। এখানে যাদের দেখছে তারা সবাই ড্রাইভার। ডুবুরি ও ফায়ার ফাইটাররা বিভিন্ন এলাকায় অভিযান চালাচ্ছে।’

এই কর্মকর্তা বলেন, ‘আমাদের উদ্ধার অভিযান চলমান থাকবে। নিখোঁজ হওয়া শেষ ব্যক্তিকে খুঁজে না পাওয়া অবধি আমরা অভিযান চালাব।’

গতকাল রোববার (২৫ সেপ্টেম্বর) বিকেল ৩টায় পার্শ্ববর্তী বড়শশী ইউনিয়নের বদেশ্বরী মন্দিরে আয়োজিত মহালয়ার উৎসবে অংশ নিতে বিভিন্ন এলাকার পুণ্যার্থীরা করতোয়া নদী পারাপারের জন্য মাড়েয়া আউলিয়া ঘাটে উপস্থিত হন। এইসময় ধারণ ক্ষমতার অতিরিক্ত যাত্রী নিয়ে নৌকাটি যাত্রা শুরু করলে মাঝপথে মোড় নিতে গিয়ে ডুবে যায়। ধারণা করা হচ্ছে, নৌকায় শতাধিক যাত্রী ছিল।

এই দুর্ঘটনায় গতকাল রাতেই ১৭ জনের মরদেহ ঘটনাস্থলের আশপাশ থেকে উদ্ধার করেন উদ্ধারকারী দল। সোমবার (২৬ সেপ্টেম্বর) সকাল থেকে নিখোঁজদের উদ্ধার করতে ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সের সদস্যরা উদ্ধার কাজ অব্যাহত রেখেছেন।

এই ঘটনায় পাঁচ সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। তদন্ত কমিটির প্রধান ও পঞ্চগড়ের অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক দীপঙ্কর রায় বলেন, এখন পর্যন্ত ৪০ জনের লাশ উদ্ধার করা হয়েছে। কয়েকজন বাদে বাকি সবার লাশ পরিবারের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে। উদ্ধার অভিযান অব্যাহত রয়েছে।

ইতোমধ্যে জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে নিহতদের সৎকারের জন্য ২০ হাজার টাকা ও আহতদের পাঁচ হাজার টাকা করে আর্থিক সহায়তা দেওয়া হয়েছে। ঘটনার সুষ্ঠু তদন্তের জন্য অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেটকে প্রধান করে পাঁচ সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে।

সোমবার দুপুরে দুর্ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছেন রেলমন্ত্রী ও স্থানীয় সংসদ সদস্য নুরুল ইসলাম সুজন, ধর্ম বিষায়ক মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী ফরিদুল হক খান এমপি, দিনাজপুর-১ আসনের সংসদ সদস্য মনোরঞ্জন শীল গোপাল, ঠাকুরগাঁও-১ আসনের সংসদ সদস্য রমেশ চন্দ্র সেনসহ স্থানীয় ক্ষমতাসীন দলের নেতাকর্মীরা।

 

 

 

আরপি/এসআর-০২


বিষয়: নৌকাডুবি


আপনার মূল্যবান মতামত দিন:

Top