রাজশাহী রবিবার, ১৪ই এপ্রিল ২০২৪, ১লা বৈশাখ ১৪৩১


এমপি ফারুক চৌধুরীকে নিয়ে যা বললেন আ’লীগ নেতা আসাদ


প্রকাশিত:
১৭ জুলাই ২০২২ ০৪:৫৮

আপডেট:
১৭ জুলাই ২০২২ ০৪:৫৮

ছবি: সংবাদ সম্মেলন

রাজশাহীতে বহুল আলোচিত অধ্যক্ষকে নিয়ে এমপি ওমর ফারুক চৌধুরীর সংবাদ সম্মেলনের ঘটনায় পাল্টা সংবাদ সম্মেলন করেছে জেলা আওয়ামী লীগের সাবেক সাধারণ সম্পাদক আসাদুজ্জামান আসাদ।

শনিবার (১৬ জুলাই) সকাল সাড়ে ১০টার দিকে রাজশাহী নগরীর লক্ষ্মীপুর মোড়ে নিজস্ব রাজনৈতিক কার্যালয়ে এ সংবাদ সম্মেলনের আয়োজন করা হয়। এ সময় লিখিত বক্তব্য পাঠ করেন রাজশাহী জেলা আওয়ামী লীগের সাবেক এই নেতা।

এর আগে গত বৃহস্পতিবার (১৪ জুলাই) সংবাদ সম্মেলন করেন এমপি ওমর ফারুক চৌধুরী। ওই সংবাদ সম্মেলনে মিথ্যাচার করা হয়েছে অভিযোগ করে তার প্রতিবাদে এই সংবাদ সম্মেলন করেন আওয়ামী লীগ নেতা আসাদুজ্জামান আসাদ।

আসাদুজ্জামান আসাদ বলেন, ‘আজকের এই দিনটি (১৬ জুলাই) আমার কাছে অনেক বেদনার দিন। ২০০৭ সালের আজকের এই দিনে তৎকালীন সেনা সমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের নির্দেশনায় গ্রেফতার হয়েছিলেন শেখ হাসিনা। তখন আমরা শপথ নিয়েছিলাম তাকে মুক্ত করে বাংলাদেশের গণতন্ত্র ও মানুষের অধিকার ফিরিয়ে আনবো। শেখ হাসিনার মুক্তির পর ক্ষমতায় আসীন হওয়ার মাধ্যমে সেই গণতন্ত্র ও অধিকার ফিরিয়ে এসেছে।’

লিখিত বক্তব্যে তিনি বলেন, ‘রাজাবাড়ী হাট ডিগ্রি কলেজের অধ্যক্ষকে মারধরের বিষয়ে এমপি ওমর ফারুক চৌধুরীর মিথ্যাচারের জবাব প্রমাণসহ তুলে ধরবো। ২০২০ সালে ফারুক চৌধুরীর দুর্নীতির বিরুদ্ধে দুদক তদন্ত শুরু করেন। অর্থ আত্মসাৎ, খাসজমি ইজারায় দুর্নীতি, সার ডিলার নিয়োগ, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিক্ষক নিয়োগে দুর্নীতি ও জামায়াত-বিএনপির লোকদের নিয়োগ দেওয়াসহ ২০ ধরণের অনিয়ম পায় দুদক।’

রাজাবাড়ী হাট ডিগ্রি কলেজের অধ্যক্ষ ছাড়াও অনেককে ওমর ফারুক নির্যাতন করেছেন উল্লেখ করে আসাদ বলেন, ‘একইভাবে ২০২১ সালের সেপ্টেম্বরে তানোরের এলজিইডি প্রকৌশলী আব্দুল্লাহ আল মামুনকে শারীরিকভাবে লাঞ্ছিত করেন এমপি ওমর ফারুক। ২০১৮ সালের ১২ আগস্ট জেলা ছাত্রলীগের তৎকালীন সহ-সভাপতি কাজী রুবেল রানাকে জুতা পেটা করে পুলিশে দেওয়ার হুমকি দেয়। একই বছরে তানোর উপজেলা ছাত্রলীগের তৎকালীন সভাপতি রবিন সরকারকে জুতা পেটা করে এমপি নিজেই।’

তার আগে ২০১৩ সালে তানোর আব্দুল করিম সরকার ডিগ্রি কলেজের অধ্যক্ষ হাবিবুর রহমানকেও বাড়িতে ডেকে নির্যাতন করেছেন তিনি। ওই বছর তানোর উপজেলার পিআইও জিয়াকে লাঞ্ছিত করেন এমপি।

এই সংসদীয় আসনের ৭০ শতাংশ নিয়োগে জামায়াত-বিএনপির ক্যাডারদের চাকরি দেওয়া হয়েছে অভিযোগ করে তিনি বলেন, ‘২০১৫ সালে গোদাগাড়ীর প্রেমতলি ডিগ্রি কলেজে প্রভাষক পদে নিয়োগ পেতে রাজাকারপুত্র সাজেদুর রহমান সুজন ও পিয়ারুল ইসলাম ফারুক চৌধুরীর হাতে ফুল দিয়ে আওয়ামী লীগে যোগ দেন। বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ৭০ শতাংশ জামায়াত-বিএনপির ক্যাডারদের চাকরি দেওয়া হয়েছে। তার তথ্য প্রমাণ আমার কাছে নামসহ আছে।’

ওমর ফারুক জাতীয় শোক দিবসে মিষ্টি বিতরণ করেছে উল্লেখ করে আসাদ আরও বলেন, ‘২০১৮ সালের ১৫ আগস্ট তৎকালীন গোদাগাড়ী উপজেলা চেয়ারম্যান ও উপজেলা বিএনপির সভাপতি ইসহাক আলীকে আওয়ামী লীগে যোগদানের নামে মিষ্টি বিতরণ করে। একই বছর ৩ নভেম্বর জেল হত্যা দিবসে ওমর ফারুক তানোরের ডা. আবু বকর হাই স্কুল অ্যান্ড কলেজে আনন্দর‍্যালি করে মিষ্টি মুখ করিয়েছিলেন। এটি আওয়ামী লীগের রাজনীতির সঙ্গে যায় না।’

এমপি ওমর ফারুক মাদক কারবারিদের আশ্রয়দাতা উল্লেখ করে তিনি বলেন, এমপির বিরুদ্ধে অভিযোগ আছে তিনি গোদাগাড়ীর মাদক কারবারিদের আশ্রয় প্রশ্রয় দেন এবং পৃষ্ঠপোষকতা করে। যার প্রমাণ আমাদের হাতে রয়েছে। সেই প্রতিবেদন বেশকিছু টেলিভিশন, জাতীয় ও স্থানীয় পত্রিকায় প্রকাশিতও হয়েছে। এছাড়া স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের তদন্তেও তাকে মাদকের পৃষ্ঠপোষক হিসেবে চিহ্নিত করে।

স্কুল-কলেজ সরকারিকরণে নামে কোটি টাকা লোপাট করেছেন জানিয়ে তিনি বলেন, তানোর-গোদাগাড়ীর স্কুল-কলেজ সরকারিকরণের নামে শিক্ষকদের কাছ থেকে কোটি কোটি টাকা নিয়েছে। তারই ধারাবাহিকতায় গোদাগাড়ী কলেজের অধ্যক্ষকে টাকার জন্য কলেজ গভর্নিং বডির সভায় গোদাগাড়ী উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি ও গোদাগাড়ী পৌরমেয়র অয়েজ উদ্দিন বিশ্বাস ও তার ছেলে মারপিট করেছিল। সেখানে ফারুক চৌধুরীও উপস্থিতি ছিলেন।

ওমর ফারুক রাজাকারের ছেলে উল্লেখ করে এই আওয়ামী লীগ নেতা বলেন, ওমর ফারুক চৌধুরী নিজেকে এখন শহীদ পরিবারের সন্তান দাবি করেন। অথচ ২০১৯ সালের ৯ সেপ্টেম্বর জাতীয় দৈনিকে তার বাবা রাজাকার বলে স্থানীয় বীর মুক্তিযোদ্ধারা বিবৃতি দেন। তার বাবা মুক্তিযুদ্ধের সময় রাজশাহী জেলা শান্তি কমিটির সদস্য ছিলেন।

ফারুক চৌধুরী নৌকায় ভোট দেননি দাবি করে তিনি বলেন, ফারুক চৌধুরী তিনবারের এমপি হলেও একবারও নৌকায় ভোট দেননি। তিনি রাজশাহী নগরীর সাগরপাড়ার ৩৪৫ নম্বর বাড়ির ভোটার। চেতনায় আওয়ামী লীগ বিরোধী ফারুক চৌধুরী পাকিস্তানপন্থী মানুষ।

একটি টিভি চ্যানেলের অনুষ্ঠানের বিবরণ দিয়ে আসাদুজ্জামান আসাদ বলেন, ওমর ফারুক চৌধুরী দাবি করেন তিনি ফ্রিডম পার্টি করেননি। কিন্তু সাংবাদিক ফারজানা রূপার উপস্থাপনায় বাংলাদেশ ফাইলস নামের একটি অনুষ্ঠানে আওয়ামী লীগের মরহুম প্রেসিডিয়াম সদস্য অ্যাডভোকেট আব্দুল মতিন খসরুর উপস্থিতিতে তাকে ফ্রিডম পার্টির নেতা হিসেবে প্রমাণ করেছে। তার ফ্রিডম পার্টি করার বিষয়ে রাজশাহীর রাজনীতি সচেতন মানুষ জানেন বলেও উল্লেখ করেন তিনি।

ফারুক চৌধুরীর রাজনৈতিক জীবন শুরু প্রসঙ্গে আসাদ বলেন, ফারুক চৌধুরী ছাত্রদলের মাধ্যমে রাজনৈতিক জীবন শুরু করেন। ১৯৮০ সালে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রসংসদ (রাকসু) নির্বাচনে ছাত্রদলের মর্তুজা-জুয়েল প্যানেল থেকে ক্রীড়া সম্পাদক পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে ছাত্রলীগের শাহ আলমের কাছে পরাজিত হন। ১৯৯১ সালের জাতীয় নির্বাচনে ফারুক চৌধুরী বিএনপির প্রার্থী ব্যারিস্টার অমি ইসলামের পক্ষে সরাসরি ভোট করেন বলেও দাবি করেন তিনি।

আওয়ামী লীগের দুই নেতার নিজেদের মাঝে কাদা ছোড়াছুড়ি বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি জানান, এসব কথা বলায় আমাদের নিজেদেরও মান সম্মান ক্ষুন্ন হয়। কিন্তু সত্য কথাটা তো কাউকে না কাউকে বলতে হবে। এটি আওয়ামী লীগকেও রক্ষা করার বিষয়। ৭৫ এর ১৫ আগস্ট বঙ্গবন্ধুকে হত্যার আগপর্যন্ত খন্দকার মোশতাকও আওয়ামী লীগের নেতা ছিল।

ফারুক চৌধুরীকে দলে ভেড়ানো প্রসঙ্গে জানতে চাইলে আসাদ বলেন, সেই সময় আমরা ভেবেছিলাম শুধু শহীদ কামারুজ্জামানের ভাগনে হিসেবে। তার অতীত সম্পর্কে খুব বেশি জানা ছিল না। আর আমাদের নেতারা যারা ভোট করতো তারা বিএনপি-জামায়াতের অর্থের সঙ্গে পেরে উঠতো না। তাই রাজশাহীর এই অঞ্চলে অর্থবিত্তের মালিকদের প্রয়োজন ছিল। তাই শুধুমাত্র শহীদ কামারুজ্জামানের ভাগনে হিসেবেই নেওয়া। কিন্তু এটি রাজনৈতিক জীবনে অপরাধ ছিল বলেও জানান তিনি।

ওমর ফারুক চৌধুরীর বিরুদ্ধে অভিযোগের ব্যাপারে পরবর্তী কার্যক্রম প্রসঙ্গে জানতে চাইলে তিনি বলেন, আমিও আওয়ামী লীগ করি, সেও আওয়ামী লীগের এমপি। কিন্তু কাউকে না কাউকে সত্য কথাটা উচ্চারণ করতে হবে, তাই আমি বলেছি। এটি নিয়ে আন্দোলন করার কিছু নেই। আওয়ামী লীগের ফোরামে একাধিকবার জানিয়েছি। আজ আবারও সাংবাদিকদের মাধ্যমে কেন্দ্রীয় আওয়ামী লীগের কাছে অনুরোধ রাখতে চাই, ‘আমি যে অভিযোগগুলো করলাম তার একটিও যদি মিথ্যা হয়, আমাকে দল থেকে বহিষ্কার করে তাকে প্রমোশন দেন। আর সব অভিযোগ যদি সত্য হয় তবে তার বিরুদ্ধে কী সিদ্ধান্ত নেবে সেটা কেন্দ্রীয় আওয়ামী লীগের ওপরই ছেড়ে দিলাম।

উল্লেখ্য, সংসদ সদস্য ওমর ফারুক চৌধুরী রাজাবাড়ী হাট ডিগ্রি কলেজের অধ্যক্ষ সেলিম রেজাকে মারধর করেছেন বলে বুধবার (১৩ জুলাই) খবর ছড়িয়ে পড়ে। খবরটি বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রকাশিত হলে তোলপাড় শুরু হয়। গোদাগাড়ীর একটি কলেজের অধ্যক্ষের স্ত্রীকে নিয়ে রাজাবাড়ী ডিগ্রি কলেজের কয়েকজন শিক্ষক আপত্তিকর মন্তব্য করলেও অধ্যক্ষ সেলিম রেজা কোনো ব্যবস্থা নেননি বলে অভিযোগ উঠে। ওমর ফারুক চৌধুরী ওই আপত্তিকর কথাবার্তার অডিও শুনিয়েই অধ্যক্ষকে বেধড়ক পেটাতে থাকেন।

একটি সংবাদ সম্মেলনে অধ্যক্ষকে মারধরের ঘটনা সত্য নয় বলে দাবি করেন এমপি ওমর ফারুক চৌধুরী। একই সঙ্গে খবরটি ভিত্তিহীন বলে জানান তিনি। জেলা আওয়ামী লীগের সাবেক সাধারণ সম্পাদক আসাদুজ্জামান আসাদ চক্রান্ত করে তার বিরুদ্ধে সংবাদ প্রকাশ করেছেন বলেও দাবি এমপির। ওই সংবাদ সম্মেলনে এমপির পাশে বসে মারধরের শিকার হননি বলে দাবি করেছিলেন অধ্যক্ষ সেলিম রেজাও।

 

 

 

আরপি/এসআর-০২



আপনার মূল্যবান মতামত দিন:

Top