রাজশাহী শনিবার, ২২শে জুন ২০২৪, ৯ই আষাঢ় ১৪৩১


করুণাহীন করোনাকাল


প্রকাশিত:
১১ জুন ২০২০ ১৭:০২

আপডেট:
২২ জুন ২০২৪ ১৪:৫৬

ছবি: প্রতীকী

বিশ্বজুড়ে ভয়ানক আতঙ্ক ছড়িয়ে করোনাভাইরাস প্রায় ঘরবন্দী করে ফেলেছে মানবজাতিকে। গোটা বিশ্বে কার্যত অচলাবস্থার সৃষ্টি হয়েছে। লক্ষ লক্ষ মানুষ আক্রান্ত, মৃতের সংখ্যাও কয়েক লাখ ছাড়িয়েছে ইতোমধ্যে। লকডাউনের কবলে পড়ে কাজ হারিয়েছে কোটি কোটি মানুষ। করোনাভাইরাস প্রথম সনাক্তকরণের পর প্রায় ছয় মাস হতে চলল। এখন পর্যন্ত কার্যকরী কোনো চিকিৎসা পদ্ধতির আবিষ্কারও সম্ভব হয়নি। টিকা আবিষ্কারের চেষ্টা চলছে অনেক দেশেই। সেটা হাতে পেতেও অনেক দেরি।

লক্ষণ আর উপসর্গ দেখে এখন পর্যন্ত চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে করোনা আক্রান্তদের। আজ একটা ওষুধ কার্যকর তো কাল আরেকটা ওষুধ- এমনটিই দাবি করা হচ্ছে দেশে দেশে। করোনাভাইরাসের ফলে সৃষ্ট এই মহামারি মোকাবেলায় হিমশিম খাচ্ছে উন্নত বিশ্বও। পৃথিবীজুড়ে এমন দুর্যোগের ঘনঘোরে বাংলাদেশেও একটা বড়সড় ধাক্কা লেগে গেছে। বার্ষিক প্রবৃদ্ধির হার কমে যাওয়া, বেকারত্ব বৃদ্ধিসহ বিশ্বের আর সব দেশের মতোই অর্থনৈতিক মন্দার শিকার বাংলাদেশও হবে বলেই ধারণা করা হচ্ছে।

করোনা ভাইরাসের কারণে বিশ্বে যা যা ঘটবে বাংলাদেশের ক্ষেত্রেও ব্যতিক্রম কিছু ঘটবে না বলেই ধরে নেওয়া যায়। তবে অর্থনীতির কথা বাদ দিলে তার পরপরই ঘুরেফিরে আসে সামাজিক বা মানবিক দিকগুলোর কথা। করোনাকালে মানুষের সাথে মানুষের সামাজিক, আত্মিক অথবা রক্তসম্পর্ক বিনষ্ট হচ্ছে বলেও সমাজবিজ্ঞানীদের কপালে চিন্তারেখা।

চারপাশ থেকে উঠে আসা খবরেও হতাশার চিহ্ন সুস্পষ্ট। করোনায় মৃত ব্যক্তির লাশ ফেলে পালিয়ে যাচ্ছে স্বজনরা। লাশ বহন, জানাজা এবং দাফন নিয়ে দেখা দিচ্ছে সঙ্কট। মসজিদের খাটিয়া দিতে বাধা দিচ্ছে মানুষ। জানাজা পড়াতে অপারগতা প্রকাশ করছে মসজিদের ইমামগণও।

কবর দেয়া বা সৎকারের সময় মৃতের আত্মীয়রা দূরে সরে থাকছে। খাটিয়া ধরতে বা লাশ কবরে নামাতেও চায় না অনেকে। তার বদলে সরকারিভাবে বা বেসরকারি স্বেচ্ছাসেবীদের দিয়েই সারতে চাইছে লাশের আনুষ্ঠানিকতা। কেউ রাস্তাঘাটে জ্ঞান হারিয়ে পড়ে থাকলেও ছুঁতে ভয় পাচ্ছে মানুষ। হাসপাতালে যাওয়ার জন্য গাড়িও মেলানো দায় কোনো কোনো ক্ষেত্রে। স্বামী ঢাকা থেকে ফেরার কারণে স্ত্রী-সন্তান ঘরে ঢুকতে বাধা দিয়েছে অনেক জায়গায়।

করোনা ভাইরাসে আক্রান্ত সন্দেহে মাকে জঙ্গলে ফেলে পালিয়ে গেছে তার সন্তানেরা। আক্রান্ত সন্দেহে মৃত ছেলের লাশ গ্রহণ করতে অস্বীকার করেছে স্বয়ং বাবা। সাপে কাটা রোগীকে ভেলায় ভাসিয়ে দেয়ার যে মিথ উপমহাদেশে ছিল সেরকমটিও ঘটেছে করোনাকালে। মৃত গার্মেন্টসকর্মীর লাশ ফেলে দেয়া হয়েছে নদীতে। আক্রান্ত ব্যক্তিকে বাসা থেকে বের করে দিয়েছে বাসাওয়ালা। করোনা হাসপাতালে কর্মরত চিকিৎসক, নার্সকে পর্যন্ত বাসায় রাখতে চায় না অনেকে।

ঢাকা বা নারায়ণগঞ্জ থেকে গ্রামে ফিরে হোম কোয়ারেন্টাইনে থাকতে চাইলেও অনেককে গ্রামে ঢুকতে দেয়া হয়নি। করোনা আক্রান্ত হওয়া বা আক্রান্ত হয়ে মারা যাওয়া এখন যেন বড় ধরনের কোনো পাপ। যার ফলে পরিবার, সমাজে মানুষ হয়ে পড়ছে একঘরে। প্রাচীন বনবাস প্রথা চালু থাকলে মানুষ নিঃসন্দেহে আক্রান্তদের বনবাসে পাঠাতে চাইত। একদিকে দেশের চিকিৎসা ব্যবস্থার বেহাল দশা, আরেকদিকে সামাজিকভাবে হেয় প্রতিপন্ন হওয়ার ভয়ে অনেকে করোনা ভাইরাসে আক্রান্ত হয়েও তা গোপন করছেন। এ যেন এক বিষাদ কালের দিনলিপি হয়ে ইতিহাসের পাতায় ঠাঁই নেয়া দুঃসময়।

করোনাভাইরাস প্রতিরোধে প্রয়োজনীয় সুরক্ষা সামগ্রী নিয়েও শুরু হয়েছে ধুন্ধুমার ব্যবসা। সাধারণ মানুষকে জিম্মি করে ব্যবসায় আখের গোছাতে ব্যস্ত কেউ কেউ। ত্রাণসামগ্রী বিতরণের ক্ষেত্রেও স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের দুর্নীতির খবর চাউর হয়েছে সারাদেশেই। তবে সবকিছুর ভিড়ে মানুষে মানুষে যে দূরত্ব আর অবিশ্বাস তাই এখন অভিশাপ হয়ে দাঁড়িয়ে গেছে সবখানে।

মানুষ মানুষকে ছেড়ে এই যে ভয়ে পালিয়ে যাচ্ছে, দূরে সরে যাচ্ছে তা যুগে যুগে সব মহামারির সময়ই দেখা গেছে। প্রথম প্রথম সাহায্য সহযোগিতার হাত বাড়ানো মানুষই প্রকোপ বাড়ার সময় উল্টা আচরণ করা শুরু করে। বাংলাদেশেও এর ভিন্ন কিছু হচ্ছে না। ঠিকমতো লকডাউন না মানা মানুষ এখন আর ঘরে থাকতে চান না। ফলে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে বাড়ছে আক্রান্তের সংখ্যা। ভারী হচ্ছে শবাগারের বাতাস। এমন পরিস্থিতিতে মুসলিমদের প্রধানতম ধর্মীয় উৎসব ঈদের আনন্দও ম্লান হয়ে গেছে।

সব ধর্মের মানুষের ধর্মীয় যত আচার-অনুষ্ঠান সবক্ষেত্রেই এসেছে বিধিনিষেধ আর নির্দেশনা। মানুষ মানুষকে অনেক দিন করমর্দন করে না, কোলাকুলি করে না। বাহবা দিয়ে কেউ আর এখন পিঠ চাপড়েও দেয় না। সামাজিক আর শারীরিক দূরত্ব বাড়তে বাড়তে মানুষের মনোজগতে এক আশ্চর্য পরিবর্তন ঘটে চলেছে অজান্তেই। যে মানুষ মানুষকে ভালোবেসে বুকে জড়িয়ে নিত সে মানুষকেই এখন ভয়ে দূরে সরিয়ে রাখছে।

এই ক্রমাগত দূরে থাকা, আতঙ্কে থাকার ফলে মানুষ হারিয়ে ফেলছে তার স্বাভাবিক মানবতাবোধ। নিষ্ঠুর হতে হতে নিষ্ঠুরতার চরম শিখরে গেলেও এখন আর অনুতাপ আসে না তাই মনে। নিজে বাঁচা‌র জন্য ব্যাকুল মানুষের কাছে করোনা আক্রান্ত বা করোনায় মৃত কেউ ভীষণ ঘৃণার পাত্রে পরিণত হচ্ছে। ভেঙে যাচ্ছে চিরচেনা মানবতাবোধ আর নৈতিকতার কাঠামো। সামাজিক জীবনের ওপর পড়ছে বিরাট এক প্রভাব। যার ফলাফল সুদূরপ্রসারী।

তবে এসবের ব্যতিক্রমও আছে। জীবন বাজি রেখে অনেকেই সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দিয়েছে করোনাকালে। ভয়ডর উপেক্ষা করে করোনা আক্রান্ত লাশ দাফন করে প্রশংসা কুড়িয়ে যাচ্ছেন অনেক মানবহিতৈষী ব্যক্তি। দুর্ভোগ থেকে মানুষকে রক্ষা করতে সামনের সারিতে কাজ করে চলেছে সরকারি-বেসরকারি অনেক প্রতিষ্ঠান।

দিনরাত অক্লান্ত পরিশ্রম করে যাচ্ছে ডাক্তার, নার্স, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনির সদস্যগণ, সরকারের বিভিন্ন সেক্টরের কর্মকর্তা-কর্মচারীবৃন্দ। অনলাইনে ক্লাস চালু রেখেছে সরকারি-বেসরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের শিক্ষকবৃন্দ। তথ্য দিয়ে সহযোগিতা করছে গণমাধ্যম। বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোও তাদের সাধ্যমতো সেবা সেবা কার্যক্রম চালু রেখেছে। এসব দেখেই আমরা এখনো আশাবাদী হই।

তারপরও কিছুটা আশঙ্কা তো থেকেই যায়। সামনে হয়তো করোনাকাল শেষ হবে। কিন্তু মানুষে মানুষে এই যে অবিশ্বাস, ভয় আর আতঙ্ক এর অবসান ঘটবে কি? আমরা কি আগের মতো আবারও পরম আনন্দে একে অপরকে জড়িয়ে ধরতে পারব আমাদের মানবিক বুকে?

লেখক: কবি ও সাহিত্যিক; সহকারী অধ্যাপক ও বিশেষ ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা, মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তর, ঢাকা; গবেষক, আইবিএস, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়।
ই-মেইল: [email protected]

 

আরপি/এমএএইচ-০১



আপনার মূল্যবান মতামত দিন:

Top