রাজশাহী বুধবার, ১৪ই অক্টোবর ২০২৬, ৩০শে আশ্বিন ১৪৩৩


রাজশাহী কলেজ ছাত্রাবাসে শিক্ষার্থীকে মারধর, হাসপাতালে ভর্তি


প্রকাশিত:
১৪ অক্টোবর ২০২৬ ২১:২১

আপডেট:
১৪ অক্টোবর ২০২৬ ২২:০২

রাজশাহী কলেজের মুসলিম ছাত্রাবাসে এক শিক্ষার্থীকে মারধরের অভিযোগ উঠেছে। বুধবার (১৪ অক্টোবর) সকালে ছাত্রাবাসের বি-ব্লকের ১০৬ নম্বর কক্ষে দুই আবাসিক শিক্ষার্থীর মধ্যে বিরোধ ও মারামারির ঘটনা ঘটে। পরে ছাত্রদলের নেতাকর্মীরা ওই শিক্ষার্থীকে মারধর করেন বলে অভিযোগ করেছেন ভুক্তভোগী শিক্ষার্থী শাহাবুর হোসেন জয়। পরে তাকে রাজশাহী মেডিকেল কলেজ (রামেক) হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। তবে ছাত্রদলের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে, এ ঘটনায় সংগঠনের সম্পৃক্ততার অভিযোগ ভিত্তিহীন।

শাহাবুর হোসেন জয় রাজশাহী কলেজের ব্যবস্থাপনা বিভাগের ২০২১-২২ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থী। অভিযুক্ত মো. ফজলে রাব্বী ওহী ইতিহাস বিভাগের ২০২৫-২৬ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থী। তারা একই কক্ষে থাকতেন।

ভুক্তভোগী শিক্ষার্থী জয় জানান, কক্ষে ওঠার পর থেকে বিভিন্ন বিষয় নিয়ে তার সঙ্গে রাব্বীর বিরোধ চলছিল। ঘটনার দিন রাব্বীর এক বন্ধুর সঙ্গে কথোপকথনের সময় তাকে অশালীন ভাষায় গালাগাল করা হয়। এর প্রতিবাদ জানালে রাব্বী তার মাথায় আঘাত করেন। পরে দুজনের মধ্যে মারামারি শুরু হলে অন্যরা তাদের সরিয়ে দেন।

জয়ের অভিযোগ, ঘটনার প্রায় ৩৫ মিনিট পর রাজশাহী কলেজ ছাত্রদলের কর্মী প্রীতম সেখানে গিয়ে তার কাছে নিজের কর্মীকে মারধরের কারণ জানতে চান। এরপর তার বক্তব্য না শুনেই প্রীতম তাকে মারধর শুরু করেন। পরে আরও কয়েকজন যোগ দিয়ে তাকে মারধর করেন। একপর্যায়ে তাকে টেনেহিঁচড়ে নিয়ে যাওয়া হয় বলেও অভিযোগ করেন জয়।

তবে অভিযুক্ত ফজলে রাব্বী ওহী তার বিরুদ্ধে অপপ্রচার চালানো হচ্ছে বলে দাবি করেছেন। তিনি বলেন, ‘আমার বিরুদ্ধে প্রোপাগান্ডা ছড়ানো হচ্ছে। এর চেয়ে বেশি আমি আর কিছু বলতে পারব না।’

প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, প্রথমে দুই রুমমেটের মধ্যে তর্কাতর্কি ও হালকা মারামারি হয়। পরে প্রীতম ও তার সহযোগীরা এসে জয়কে মারধর করেন। এ সময় জয়ের নাক-মুখ দিয়ে রক্তক্ষরণ শুরু হয়। পরে তাকে মেডিকেলে নেওয়া হয়।

একই ব্লকের শিক্ষার্থী ইয়াজ উদ্দিন জানান, হোস্টেল সুপারের তত্ত্বাবধানে তিনি জয়কে হাসপাতালে নিয়ে যান। সেখানে গিয়ে তাকে রক্তবমি করতে এবং নাক-মুখ দিয়ে রক্তক্ষরণ হতে দেখেন। পরে তাকে রামেক হাসপাতালের ৮ নম্বর ওয়ার্ডের ২১ নম্বর শয্যায় ভর্তি করা হয়।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক আরেক শিক্ষার্থী বলেন, শুরুতে দুই রুমমেটের মধ্যে তর্কাতর্কি থেকে হালকা মারামারি হয়। এর প্রায় আধা ঘণ্টা পর প্রীতম ও কয়েকজন এসে জয়কে মারধর করেন। এতে তার নাক-মুখ দিয়ে রক্ত বের হতে শুরু করে।

এ ঘটনায় কলেজ প্রশাসনের কাছে অভিযোগ জানাতে যান রাজশাহী কলেজ শাখা ইসলামী ছাত্রশিবিরের নেতারা। অভিযোগ শেষে প্রতিক্রিয়া জানান সংগঠনটির কলেজ শাখার সভাপতি মোশাররফ হোসেন। তিনি বলেন, দুই রুমমেটের মধ্যে বিরোধের জেরে প্রথমে জয়কে মারধর করা হয়। পরে ছাত্রদলের নেতাকর্মীরা দলবদ্ধভাবে তাকে মারধর করেন। এতে তার নাক দিয়ে রক্তক্ষরণ ও বমি হয়। ছাত্রাবাসে এর আগেও সাধারণ শিক্ষার্থীদের মারধর ও হয়রানির ঘটনা ঘটেছে। এসব ঘটনায় কলেজ ও হোস্টেল প্রশাসন কার্যকর ব্যবস্থা না নেওয়ায় পরিস্থিতির অবনতি হয়েছে।

মোশাররফ হোসেন জানান, ছাত্রশিবিরের পক্ষ থেকে ছাত্রাবাসের সিসিটিভি ফুটেজ সংগ্রহ করে ঘটনার সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের শনাক্ত করার দাবি জানানো হয়েছে। পাশাপাশি রাজনৈতিক পরিচয় বিবেচনা না করে দায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া, প্রমাণিত অপরাধীদের ছাত্রাবাসের আসন বাতিল এবং দায়িত্ব পালনে ব্যর্থ হোস্টেল প্রশাসনের সদস্যদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানানো হয়েছে। এর আগে ছাত্রাবাসের বিভিন্ন ব্লকে শিক্ষার্থীকে মারধর, গভীর রাতে ডেকে নিয়ে নির্যাতন এবং মাগরিবের পর তিনটি ককটেল বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটেছে। এসব ঘটনায় কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি বলেও দাবি করেন তিনি।

তবে এ ঘটনায় ছাত্রদলের পক্ষ থেকে সংগঠনের সম্পৃক্ততার অভিযোগ অস্বীকার করা হয়েছে। তাদের দাবি, জয়কে মারধরের ঘটনায় ছাত্রদলের কোনো সাংগঠনিক সম্পৃক্ততা নেই। ঘটনার সঙ্গে সংগঠনের নাম জড়িয়ে যে অভিযোগ তোলা হচ্ছে, তার কোনো ভিত্তি নেই। তবে ঘটনার প্রকৃত কারণ এবং এর সঙ্গে কারা জড়িত, তা তদন্তের মাধ্যমে স্পষ্ট হবে।

রাজশাহী কলেজ ছাত্রদলের সাধারণ সম্পাদক রাশিকুজ্জামান প্রীতম বলেন, ‘রুমমেটদের মধ্যকার ঝামেলায় ছাত্রদলের নাম জড়িয়ে দেওয়া সম্পূর্ণ উদ্দেশ্যপ্রণোদিত। কোনো একটি পক্ষ ইচ্ছাকৃতভাবে ছাত্রদলের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন করতে এ অভিযোগ এনেছে। তবে কোনো অবস্থাতেই নিজেদের মধ্যে মারামারি কাম্য নয়। যারা সত্যিকার অর্থেই দোষী, তাদের শাস্তির আওতায় আনা হোক।’

রাজশাহী কলেজের মুসলিম ছাত্রাবাসের প্রধান তত্ত্বাবধায়ক ও পদার্থবিজ্ঞান বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক মোস্তফা নাসিরুল আজম বলেন, ‘দুই রুমমেটের মধ্যে মারামারির পর তৃতীয় পক্ষ এসে বিষয়টি আরও ঘোলাটে করেছে। তবে কোনো দলীয় সংশ্লিষ্টতা পাওয়া যায়নি। দুই পক্ষের হয়ে দুটি দল অবস্থান নিয়েছে। তদন্ত সাপেক্ষে পরবর্তী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’

রাজশাহী কলেজের উপাধ্যক্ষ অধ্যাপক আবু মো. ইউনুছ আলী বলেন, ‘আমরা শুনেছি, ছাত্রাবাসে দুই রুমমেটের মধ্যে মারামারি হয়েছে। পরে বিষয়টি আরও বড় আকার ধারণ করে। কলেজ প্রশাসনের পক্ষ থেকে আমরা ভুক্তভোগী জয়কে দেখতে গিয়েছিলাম। তার শারীরিক অবস্থার পরিপ্রেক্ষিতে পরে তাকে রামেক হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ তদন্তের ভিত্তিতে নিয়ম অনুযায়ী পরবর্তী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’



আপনার মূল্যবান মতামত দিন:

Top