রাজশাহী বৃহঃস্পতিবার, ৩রা এপ্রিল ২০২৫, ২১শে চৈত্র ১৪৩১


সীমান্ত হত্যা বন্ধে একমত বিজিবি-বিএসএফ


প্রকাশিত:
১০ আগস্ট ২০২২ ০৬:৩৮

আপডেট:
৩ এপ্রিল ২০২৫ ১৪:৫৮

ছবি: সংগৃহিত

বাংলাদেশ-ভারতের যৌথ সীমানা চার হাজার কিলোমিটারের বেশি। যৌথ নদী আছে ৫৪টি। দুই দেশের জন্য তাই অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো সীমান্ত। দীর্ঘ সীমানা ভাগ করায় প্রতিবেশী দুই দেশের মধ্যে কিছু সমস্যা-সম্ভাবনাও বিরাজমান। চোরাচালান, সীমান্ত হত্যা, পণ্য আমদানি-রপ্তানি, আন্তঃদেশীয় পরিবহন ব্যবস্থা, আন্তর্জাতিক সীমারেখায় উন্নয়নমূলক কাজ, অবৈধ অনুপ্রবেশ, মানবপাচার প্রভৃতি বিষয় সামনে আসে ঘুরেফিরে। এমন বেশ কিছু বিষয় নিয়ে দুই দেশের সীমান্তরক্ষী বাহিনী একসঙ্গে কাজ করতে সম্মত হয়েছে।

পাঁচ দিনব্যাপী (১৭-২১ জুলাই) ৫২তম সীমান্ত সম্মেলনে বিজিবি-বিএসএফ মহাপরিচালক পর্যায়ের বৈঠকে এসব বিষয়ে এসেছে বেশকিছু সিদ্ধান্ত।

বিএসএফ মহাপরিচালক পঙ্কজ কুমার সিংয়ের নেতৃত্বে ভারতের স্বরাষ্ট্র ও পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের প্রতিনিধিসহ ৯ সদস্যের প্রতিনিধিদল এবং বিজিবি মহাপরিচালক মেজর জেনারেল সাকিল আহমেদের নেতৃত্বে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়, পররাষ্ট্র ও স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, যৌথ নদী কমিশন, মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর, সার্ভেয়ার জেনারেল অব বাংলাদেশ এবং ভূমি রেকর্ড ও জরিপ অধিদপ্তরের সংশ্লিষ্ট প্রতিনিধিসহ ২০ সদস্যের প্রতিনিধিদল সম্মেলনে অংশ নেন।

বৈঠক নিয়ে বিজিবির একটি সূত্র জানায়, দুই দেশের মধ্যে থমকে থাকা উন্নয়নমূলক কাজ বাস্তবায়নের বিষয়ে নিজ নিজ ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে সম্পৃক্ত করে এগিয়ে যাওয়ার ব্যাপারে পারস্পরিকভাবে সম্মত হয়েছে। পারস্পরিক ঐকমত্যের ভিত্তিতে যৌথ নদী কমিশন অনুমোদিত সীমান্তের অভিন্ন নদীগুলোর বন্ধ থাকা তীর সংরক্ষণ কাজ পুনরায় শুরুর জন্য যথাযথ উদ্যোগ গ্রহণে সম্মত হয়েছে দুই দেশের সীমান্তরক্ষী বাহিনী।

বিজিবি ও বিএসএফ মহাপরিচালক তাদের বক্তব্যে বলেন, সব বিষয়ে আমাদের মধ্যে খোলামেলা আলোচনা হয়েছে। এর মধ্যে অনেক বিষয়ে সম্মতি জানিয়েছি আমরা। এসব সিদ্ধান্ত যত দ্রুত সম্ভব বিওপি পর্যায়ে উপস্থাপন করা হবে। যে গতি নিয়ে আমাদের মধ্যে আলোচনা হয়েছে সেসব বিষয়ে আসা সিদ্ধান্ত দ্রুত বাস্তবায়নের জন্য আমরা কাজ করে যাবো।

পিলখানায় ৫২তম সীমান্ত সম্মেলনের আনুষ্ঠানিক বৈঠক শেষে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে বিজিবি মহাপরিচালক মেজর জেনারেল সাকিল আহমেদ বলেন, সীমান্তে একটি হত্যা মানে শুধু একজন মানুষের মৃত্যু নয়, এতে নিহতের পুরো পরিবার ভুক্তভোগী হয়। এলাকার মানুষের মধ্যে নেতিবাচক প্রভাব পড়ে। আমাদের সীমান্তরক্ষী বাহিনীর মধ্যে যে পেশাদার সম্পর্ক, সেটাও প্রশ্নবিদ্ধ হয়। এসব আমরা বিএসএফকে বুঝিয়েছি। তারাও বুঝেছেন। আমরা সব সমস্যা একীভূত করে ধীরে ধীরে সেগুলো শূন্যের কোঠায় নামিয়ে আনতে চাই। আমাদের যে স্পিরিট সেটা কাজে লাগাতে পারলে তা সম্ভব বলে আমরা আশাবাদী।

সম্মেলনে আলোচিত বিষয়:
সীমান্তে উভয় দেশের নিরস্ত্র নাগরিকদের হত্যা/আহত/মারধরের ঘটনা শূন্যের কোঠায় নামিয়ে আনার লক্ষ্যে অধিক সতর্কতামূলক ও কার্যকরী উদ্যোগ হিসেবে সীমান্তে যৌথটহল জোরদার, বিশেষ করে রাত্রিকালীন টহল পরিচালনার ব্যাপারে উভয়পক্ষ সম্মত হয়েছে। এছাড়া সীমান্তে আক্রমণ/হামলার ঘটনা শূন্যের কোঠায় নামিয়ে আনার লক্ষ্যে ঝুঁকিপূর্ণ সীমান্তে সমন্বিত যৌথটহল পরিচালনাসহ অতিরিক্ত সতর্কতামূলক ব্যবস্থা গ্রহণ, জনসচেতনতামূলক কর্মসূচি জোরদারকরণ, সীমান্ত এলাকায় বসবাসকারী নাগরিকদের আন্তর্জাতিক সীমানা আইনের বিধি-বিধান সম্পর্কে সচেতনতামূলক কার্যক্রম গ্রহণের ব্যাপারে উভয়পক্ষ সম্মত হয়।

সমন্বিত সীমান্ত ব্যবস্থাপনা পরিকল্পনা-সিবিএমপির ওপর গুরুত্বারোপ করে বিভিন্ন নিষিদ্ধ পণ্যসামগ্রী পাচার বন্ধ এবং সীমান্ত অপরাধ দমনের লক্ষ্যে সিবিএমপি বাস্তবায়ন ও উভয় সীমান্তরক্ষী বাহিনী উপকৃত হবে এমন তথ্য আদান-প্রদানে দুই পক্ষ সম্মত হয়।

আন্তর্জাতিক সীমানা লঙ্ঘন/অবৈধ অনুপ্রবেশ, চোরাচালান, মানবপাচার, সীমানা পিলার উপড়ে ফেলা ও অন্যান্য সীমান্ত অপরাধ থেকে সীমান্তবর্তী জনসাধারণকে বিরত রাখতে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণের বিষয়ে উভয়পক্ষ সম্মত হয়েছে। উভয়পক্ষ বাংলাদেশ-ভারত সীমান্ত অতিক্রম করে বলপূর্বক বাস্তুচ্যুত মিয়ানমারের নাগরিকদের অনুপ্রবেশের বিরুদ্ধে যথাযথ ও দৃঢ় অবস্থান গ্রহণের ব্যাপারেও একমত। সর্বোপরি উভয়পক্ষ সীমান্তের অলঙ্ঘনীয়তা বজায় রাখার ব্যাপারে নিশ্চয়তা দিয়েছে।

দুই দেশ ১৫০ গজের মধ্যে বন্ধ থাকা উন্নয়নমূলক কাজ করার বিষয়ে নিজ নিজ ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে সম্পৃক্ত করে বিষয়টি ত্বরান্বিত করার ব্যাপারে পারস্পরিক সম্মতি জ্ঞাপন করে। পারস্পরিক ঐকমত্যের ভিত্তিতে যৌথ নদী কমিশন অনুমোদিত সীমান্তের অভিন্ন নদীগুলোর বন্ধ থাকা তীর সংরক্ষণ কাজ পুনরায় শুরু করার জন্য যথাযথ উদ্যোগ গ্রহণের বিষয়ে উভয়পক্ষ সম্মত হয়। এছাড়া সীমান্তের ১৫০ গজের মধ্যে একসারি বিশিষ্ট কাঁটাতারের বেড়া নির্মাণকাজ অনুমোদিত স্থান ও অনুমোদিত ডিজাইন অনুযায়ী ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের মাধ্যমে দ্রুত নিষ্পত্তি করতে উদ্যোগ গ্রহণ করার বিষয়েও উভয়পক্ষ সম্মত।

সন্ত্রাস ও বিচ্ছিন্নতাবাদী গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে নিজ নিজ সরকারের জিরো টলারেন্স নীতির বিষয়টি তুলে ধরে উভয়পক্ষই এর বিরুদ্ধে যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণ, সুনির্দিষ্ট তথ্য আদান-প্রদান ও নিজ নিজ সীমান্তে প্রয়োজনীয় আভিযানিক তৎপরতা অব্যাহত রাখার বিষয়ে ঐকমত্যে পৌঁছায়।

রাজশাহী সীমান্তের চর মাজারদিয়া ও খানপুর এলাকায় বসবাসরত স্থানীয় জনসাধারণের চলাচলের সুবিধার্থে শুষ্ক মৌসুমে পদ্মা নদীর ভারতীয় অংশের ১ দশমিক ৩ কিলোমিটার চ্যানেল ব্যবহারের অনুমতি প্রদানের বিষয়ে আলোচনা করা হয়। এছাড়া দীর্ঘদিন ধরে বন্ধ থাকা আখাউড়া-লাকসাম রেলওয়ে প্রকল্পের কাজ যথা শিগগির আবারও শুরু করতে ভারতের পক্ষ থেকে সম্মতি পাওয়ার ব্যাপারে আলোচনা করা হয়। উভয় বিষয়ে তাদের ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে প্রয়োজনীয় অনুমোদন পাওয়ার জন্য তারা সর্বাত্মক প্রচেষ্টা চালাবেন বলে বিএসএফ মহাপরিচালক আশ্বাস দেন

উভয়পক্ষ বিদ্যমান পারস্পরিক বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক অটুট রাখা ও পারস্পরিক আস্থা বৃদ্ধির জন্য সমন্বিত সীমান্ত ব্যবস্থাপনা পরিকল্পনার আওতায় বিভিন্ন খেলাধুলা, সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড, যৌথ রিট্রিট সেরেমনি, প্রশিক্ষণ কার্যক্রম, পারস্পরিক সাক্ষাতের বিষয়ে উদ্যোগ নিতে সম্মত হয়েছে।

এসব বিষয়ে জানতে চাইলে বিজিবির পরিচালক (অপারেশন) লে. কর্নেল ফয়জুর রহমান জাগো নিউজকে বলেন, বিজিবি-বিএসএফ মহাপরিচালক পর্যায়ের ৫২তম সীমান্ত সম্মেলন বৈঠকে দুই দেশের মধ্যে থমকে থাকা উন্নয়নমূলক কাজ বাস্তবায়নের বিষয়ে নিজ নিজ ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে সম্পৃক্ত করে এগিয়ে যাওয়ার ব্যাপারে পারস্পরিকভাবে সম্মত হয়েছি আমরা। শুষ্ক মৌসুমে পদ্মা নদীর ভারতীয় অংশের ১ দশমিক ৩ কিলোমিটার চ্যানেল ব্যবহারের অনুমতি, আখাউড়া-লাকসাম রেলওয়ে প্রকল্পের কাজ শিগগির শুরু করা, বাংলাদেশ-ভারত সীমান্তে ১৫০ গজ আন্তর্জাতিক সীমারেখায় দীর্ঘদিন ধরে স্থবির হওয়া বিভিন্ন উন্নয়নমূলক কাজ বাস্তবায়নে নিজ নিজ কর্তৃপক্ষকে সম্পৃক্ত করে দ্রুত সিদ্ধান্ত গ্রহণে একমত হয়েছি।

তিনি বলেন, সমন্বিত সীমান্ত ব্যবস্থাপনা পরিকল্পনার ওপর গুরুত্বারোপ করে বিভিন্ন নিষিদ্ধ পণ্য পাচার রোধ এবং সীমান্ত অপরাধ দমনের লক্ষ্যে সিবিএমপি বাস্তবায়ন ও উভয় সীমান্তরক্ষী বাহিনী উপকৃত হবে এমন তথ্য আদান-প্রদানে সম্মত হয়। সার্বিকভাবে দুই দেশের সীমান্তে উভয় দেশই উপকৃত হবে বলে ৫২তম সীমান্ত সম্মেলনে একাধিক বিষয় একমত পোষণ করা হয়।

আরপি/ এসএইচ- ০৮



আপনার মূল্যবান মতামত দিন:

Top