রাজশাহী সোমবার, ৬ই ফেব্রুয়ারি ২০২৩, ২৫শে মাঘ ১৪২৯


ব্রি ধান-৮৭ চাষে খুশি চাষিরা


প্রকাশিত:
২৯ নভেম্বর ২০২২ ২১:২৫

আপডেট:
৬ ফেব্রুয়ারি ২০২৩ ২১:১৬

ব্রি ধান-৮৭

বরেন্দ্র অঞ্চলে বেশ আগে থেকেই স্থানীয় আমন জাতের ধান চাষ হয়ে আসছে। স্থানীয় কৃষকরা স্বর্ণা ধান চাষে বেশ স্বাচ্ছ্যন্দ বোধ করেন। এই স্বর্ণা জাত ভারতীয়। তবে, এই ধানের সাথে পাল্লা দিতে বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউট ব্রি ধান-৮৭ জাত উদ্ভাবন করেছে। আগেকার সেই ভারতীয় স্বর্ণা ধানের জায়গায় চাষ হচ্ছে নতুন ধান। ফলনে ভালো ও খড়ের লজিং সমস্যা না থাকায় খুশি চাষিরা।

পাশর্^বর্তী দেশ ভারতের জাত আমাদের দেশে ঢুকে পড়ে নানা ভাবে। আর সেই জাতের প্রভাবে বছরের পর বছর ক্ষতির সম্মুখীন হতে হচ্ছে আমাদের। একটি জাতের ধান পর্যায়ক্রমে চাষে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে জমি। রোগবালাই বেড়ে যাওয়ায় বাড়ছে কৃষকের উৎপাদন খরচ, কমছে ফলন। দীর্ঘমেয়াদি স্বর্ণায় বাধাগ্রস্ত হচ্ছে শস্য বিন্যাস। আমন চাষের ক্ষেত্রে চাষিরা পরিকল্পনা সাজাতে না পারায় বোরোতে সমস্যা হচ্ছে। তেলজাতীয় ফসলের উৎপাদনে বাঁধা হচ্ছে।


এ বিষয়ে কথা হয় বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউটের ঊর্ধ্বতন বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ও রাজশাহী কেন্দ্রের প্রধান ড. ফজলুল ইসলামের সাথে। ভারতীয় স্বর্ণা ধান চাষের বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, স্বর্ণা চাষে কৃষককে নিরুৎসাহিত করা হচ্ছে। ভারতীয় ধানের জাতে রোগবালাই বেশি। সে রোগবালাই দেশীয় জাতেও চলে আসতে পারে। এজন্য আমাদের উদ্ভাবিত উচ্চফলনশীল জাতের ধানচাষে কৃষককে উৎসাহিত করছি। ধানের বীজ উৎপাদন সহজ উল্লেখ করে কৃষককে নিজের বীজ উৎপাদন করে সংরক্ষণের তাগিদ দেন এ কৃষিবিজ্ঞানী।

তিনি বলেন, দেশের উত্তরাঞ্চলের সুপরিচিত স্থানীয় উন্নত জাত স্বর্ণা। ভালো ফলনের জন্য কৃষককের কাছে জনপ্রিয়তা পেয়েছে স্বর্ণা। বিষয়টি মাথায় রেখেই স্বর্ণার বিকল্প জাত ব্রি ধান ৯৩, ব্রি ধান ৯৪ ও এবং ব্রি ধান ৯৫ উদ্ভাবন করেছে বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউট। এসব জাত সম্প্রসারণেরও কাজ করছে কৃষি সম্প্রসারণ দপ্তর। এসব জাত স্বর্ণার মতোই দেখতে, জীবনকালও প্রায় একই। তবে রোগ প্রতিরোধী এবং উচ্চফলনশীল।

কেবল উৎপাদনই নয়, কৃষক উচ্চফলনশীল জাতে গেলে শস্যবিন্যাস বদলে যাবে।

একটি জাত প্রতিস্থাপন করতে হলে আরেকটি জাতের প্রয়োজন। এমন বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, রাজশাহী অঞ্চলে আমন মৌসুমের জন্য উপযোগী স্বল্প জীবনকালের জাত ব্রি ধান-৮৭। বীজ বপন থেকে শুরু করে ফসল কেটে ঘরে তুলতে ১২০-১২৫ দিন সময় লাগে। এ জাতের কাণ্ড শক্ত হওয়ায় গাছ হেলে পড়ে না। ফলে সহজেই যান্ত্রিক উপায়ে কাটা যায়। তাছাড়া কাণ্ড লম্বা হওয়ায় খড়ও পাওয়া যায় প্রচুর। ব্রি ধান-৮৭ তুলে নির্বিঘ্নে সরিষা, ডাল ফসল অথবা আগাম আলু চাষ করা যায়। রবি ফসল তুলে সময়মতো বোরো ধানও চাষ করা যায়।


সময়মতো বোরো ধান চাষে আমনের জাত নির্বাচন জরুরি বলে মনে করেন এ কৃষিবিজ্ঞানী। তিনি বলেন, রাজশাহীজুড়ে সারা বছরই ধান পাকছে। আউশ ধান চাষের ক্ষেত্রে ব্রি ধান-৯৮ খুবই উপযোগী। এ জাতের ধানের ফলনও ভালো। স্বল্পমেয়াদি এ জাতের ধান তুলে আমন ধান চাষ করা যায়।

এদিকে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বছরজুড়ে শস্য বিনাসে আমনের জাত নির্বাচন জরুরি। ফলন বাড়াতে স্বল্পমেয়াদি, রোগ প্রতিরোধী এবং উচ্চ ফলনশীল উন্নত জাত নির্বাচনে কৃষককে পরামর্শ দিয়েছেন তারা।

রাজশাহী আঞ্চলিক কৃষি দপ্তর সূত্র জানায়, ২০০৮-০৯ কৃষি মৌসুমে রাজশাহী, নওগাঁ, নাটোর ও চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলায় রোপা আমন ছিল ৪ লাখ ৭ হাজার ১৮০ হেক্টর। এর প্রায় পুরোটাই স্বর্ণা। তখন ফলন হয়েছিল ১০ লাখ ১৮ হাজার ১১২ টন। এর মধ্যে রাজশাহীতে ৮৬ হাজার ৭৮০ হেক্টরে ২ লাখ ২৭ হাজার ৭৭০ টন, নওগাঁয় ২ লাখ ৯ হাজার ১০ হেক্টরে ৫ লাখ ১৪ হাজার ২৮৫ টন, নাটোরে ৫৫ হাজার ৪৫০ হেক্টরে ১ লাখ ৩৬ হাজার ৭২১ টন এবং চাঁপাইনবাবগঞ্জে ৫৫ হাজার ৯৪০ হেক্টরে ১ লাখ ৩০ হাজার ৩৩৬ টন।


পাঁচ বছর পর ২০১৩-১৪ মৌসুমে এ অঞ্চলে রোপা আমনের চাষ দাঁড়ায় ৩ লাখ ৭৬ হাজার ৩৮০ হেক্টর। ফলন দাঁড়ায় ১০ লাখ ৯৯ হাজার ১৬৯ টন। কৃষি দপ্তরের চেষ্টায় এ পাঁচ বছরে বেড়েছে উচ্চফলনশীল জাতের আম চাষ।

সর্বশেষ গত আমন মৌসুমে এ অঞ্চলে ৩ লাখ ৮৫ হাজার ৯২৯ হেক্টর জমিতে রোপা আমন ছিল। এতে ফলন হয়েছে ১২ লাখ ৭ হাজার ৯৯২ টন। এর মধ্যে রাজশাহীতে ৭৭ হাজার ৯৬ হেক্টরে ২ লাখ ৫৩ হাজার ৫৫৯ টন, নওগাঁয় ১ লাখ ৯১ হাজার ৬৬৪ হেক্টরে ৫ লাখ ৯ হাজার ৪৩৫, নাটোরে ৬৩ হাজার ৯৫৯ হেক্টরে ২ লাখ ৪ হাজার ৯৬৪ এবং চাঁপাইনবাবগঞ্জে ৫৩ হাজার ২১০ হেক্টরে ১ লাখ ৫৯ হাজার ৩৩ টন ধান উৎপাদন হয়েছে।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এক যুগ আগেও এ অঞ্চলের প্রায় ৮০ শতাংশ জমিতে প্রচলিত ধানের চাষ হতো। কৃষি দপ্তরের চেষ্টায় উচ্চফলনশীল জাতে আগ্রহ বাড়ছে কৃষকের। এতে বাড়ছে ফলন।

চাষীরা বলছেন, এখন রোগবালাই দেখা দিচ্ছে স্বর্ণায়। সবচেয়ে বেশি আক্রমণ মাজরা পোকা, বাদামি গাছফড়িং, খোলাপচার মতো রোগের। ফলে দিনে দিনে ফলন কমছে। আগে বিঘায় ১৮-২০ মন ফললেও এখন স্বর্ণার উৎপাদন ১০-১৫ মণে দাঁড়িয়েছে।

কৃষি সম্প্রসারণ অধিপ্তরের মাঠ পর্যায়ের কর্মকর্তারাও বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন। তারা বলছেন, ভারতীয় স্বর্ণার বয়স দুই দশকেরও বেশি। মূলত বাড়তি ফলনের আশায় স্বর্ণা চাষে ঝুঁকেছেন চাষী। তবে এক জমিতে একটানা এ ধান চাষে ফলন ক্রমে নিম্নমুখী হতে শুরু করেছে। রোগবালাই বেড়েই চলেছে। ফলে স্বর্ণা থেকে চাষীদের ফিরে আসার আহ্বান জানাচ্ছেন তারা।


বিষয়:


আপনার মূল্যবান মতামত দিন:

Top