রাজশাহী শুক্রবার, ১৪ই জুন ২০২৪, ১লা আষাঢ় ১৪৩১


রমজানে সুন্দর আচরণে বিশেষ গুরুত্ব কেন দিবেন?


প্রকাশিত:
২৬ মার্চ ২০২৩ ০৬:৩৭

আপডেট:
২৬ মার্চ ২০২৩ ০৬:৩৮

প্রতীকী ছবি

মাহে রমজান মুমিনের জন্য আল্লাহর পক্ষ থেকে বিশেষ উপহার। এই মাসে প্রত্যেক নেক আমলের সওয়াব বেশি। দান-সদকা, কল্যাণমূলক কাজ, সুন্দর আচরণ ও হাসিমুখে কথা বলা ইত্যাদি পবিত্র রমজানে সুন্দর ইবাদতের অংশ। একইভাবে যেকোনো গুনাহের কাজ থেকে দূরে থাকা আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভে সহায়ক।

উঁচু-নিচু, সাদা-কালো সবার সঙ্গে সুন্দর ও শোভনীয় আচরণের নির্দেশ দেয় ইসলাম। পবিত্র কোরআনে আল্লাহ তাআলা মানুষকে সুন্দর ও উত্তম কথা বলার নির্দেশ দিয়ে বলেছেন—‘তোমরা মানুষের সঙ্গে উত্তম ও সুন্দর কথা বলো।’(সুরা বাকারা: ৮৩)

আবু হুরায়রা (রা.) বর্ণিত, রাসুল (স.)-কে জিজ্ঞেস করা হলো, কোন আমলের কারণে মানুষ বেশি জান্নাতে যাবে? তিনি বললেন, আল্লাহভীতি ও সুন্দর আচরণ।’ (তিরমিজি: ২০০৩)

অন্যের সঙ্গে হাসিমুখে কথা বলাকেও গুরুত্ব দিতে বলেছেন মহানবী (স.)। ‘ভালো কাজের ছোট অংশকেও অবজ্ঞা করো না, যদিও তা তোমার ভাইয়ের সঙ্গে হাসিমুখে সাক্ষাতের মাধ্যমে হয়।’ (রিয়াজুস সালেহিন: ৬৯৪)

পবিত্র রমজান মাসে এসব বিষয় খুবই গুরুত্বপূর্ণ। কেননা রমজান মাসটিই হচ্ছে সহানুভূতির মাস। পরস্পরের দুঃখ-কষ্ট উপলব্ধি করার মাস। তাই এই মাসে বেশি বেশি দান-সদকা করা, রোজাদারকে ইফতার করানোর কথা বলা হয়েছে। হাদিসে এসেছে, কেউ কোনো রোজাদারকে ইফতার করালে রোজার সওয়াব ছাড়াও তাকে আরেকটি পূর্ণ রোজার সওয়াব দেওয়া হবে। অথচ রোজাদারের রোজা থেকে সওয়াবের একটিও কমতি করা হবে না।

ইসলামে সুন্দরভাবে কথা বলা সদকার সমতুল্য। হজরত আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (স.) বলেন, ‘সূর্য উদিত হওয়া প্রতিটি দিবসেই মানুষের প্রতিটি অঙ্গপ্রত্যঙ্গের ওপর সদকা দেওয়া আবশ্যক হয়। দুজনের মধ্যে বিবাদ নিরসন করা সদকার সমতুল্য। কাউকে বাহনে উঠতে কিংবা কোনো সামগ্রী বাহনে তুলে দিতে সাহায্য করা সদকা। সুন্দর কথা বলা সদকা। নামাজে যাওয়ার প্রতিটি পদক্ষেপ সদকা। পথ থেকে কষ্টদায়ক বস্তু সরিয়ে ফেলা সদকা।’ (মুসলিম: ১০০৯)

অনেককে দেখা যায় রমজানে ক্ষুধার তাড়নায় মেজাজ হারিয়ে ফেলে। মানুষের সঙ্গে রুক্ষ্ণ আচরণ করে। এটি রমজানের শিষ্টাচারবহির্ভুত। রোজা রাখলে ক্ষুধা লাগবে, পিপাসা পাবে— এটাই স্বাভাবিক। কিন্তু এর প্রভাব যেন কোনোভাবেই আচরণে প্রকাশ না পায়। রমজানের সুফল পেতে হলে ঝগড়াঝাঁটি, গিবত মিথ্যাচার, অশ্লীলতা ইত্যাদি বর্জনীয়। রাসুল (স.) বলেছেন, ‘যে আল্লাহর জন্যে বিনয়ী হয়, আল্লাহ তাকে মর্যাদাসিক্ত করেন। তখন সে নিজের চোখে তুচ্ছ হলেও মানুষের চোখে অনেক বড় বিবেচিত হয়।’ (বায়হাকি: ৭৭৯০)

রাসুলুল্লাহ (স.) আরও বলেছেন, ‘অনেক রোজা পালনকারী রোজা দ্বারা উপোস থাকা ছাড়া আর কিছু পায় না। অনেক রাত জেগে নামাজ আদায়কারী রাত্রি জাগরণ ছাড়া আর কিছু লাভ করে না।’ (সুনান ইবনে মাজাহ: ১৬৯০)

সুতরাং মানুষের সঙ্গে কথা বলতে হবে বিনয়ী হয়ে ও নম্রভাবে। এটি রাসুল (স.) শাশ্বত ও চিরন্তন সুন্নত। আর দুর্বোধ্যতা ও অহংকারের সঙ্গে কথা বলা ইসলামে নিষিদ্ধ। বাচাল ও অহংকারীদের অপছন্দ করেন রাসুলুল্লাহ (স.)। ‘তোমাদের মধ্যে আমার সবচেয়ে প্রিয় ও কেয়ামতের দিন আমার সবচেয়ে কাছে থাকবে যে তোমাদের মধ্যে অধিকতর সুন্দর চরিত্রের অধিকারী। আর আমার কাছে সবচেয়ে ঘৃণিত ও আমার কাছ থেকে সবচেয়ে দূরে থাকবে বাচাল ও অহংকারী।’ (তিরমিজি: ২১০৮)

এক হাদিসে রাসুল (স.) তার প্রিয় সাহাবি আনাস বিন মালিক (রা.)-কে বলেন, হে বৎস! তোমার পক্ষে যদি সম্ভব হয় তুমি সকাল সন্ধ্যা এমন অবস্থায় অতিবাহিত করবে যে, তোমার অন্তরে কারো প্রতি বিদ্বেষ নেই। কারণ এটি আমার সুন্নাহ। আর যে আমার সুন্নাহকে জিন্দা করে সে আমাকে ভালবাসে। আর যে আমাকে ভালবাসে, সে আমার সঙ্গে জান্নাতে থাকবে। (তিরমিজি: ২৬৭৮)

কারও ভুলের জন্যে কষ্টদায়ক কথা বলা উচিত নয়। এসব শুধুমাত্র রমজানের জন্য নয়, বরং সবসময়ের জন্য। তবে রমজানে যেকোনো খারাপ কাজ থেকে দূরে থাকা এবং সুন্দর আচরণসহ সকল নেক আমলের প্রতি সচেষ্ট হওয়া মুমিনের গুণ। কেউ ভুল করলেও সুন্দর কথার মাধ্যমে বুঝিয়ে বলা মহানবী (স.)-এর শিক্ষা। আনাস (রা.) বর্ণনা করেন, ‘আমরা রাসুলুল্লাহ (স.)-এর সঙ্গে মসজিদে অবস্থান করছিলাম। ঠিক তখন একজন গ্রাম্যলোক এসে মসজিদে দাঁড়িয়ে প্রস্রাব করতে শুরু করল। সাহাবিরা তাকে বললেন, থামো, থামো। কিন্তু রাসুলুল্লাহ (সা.) বললেন, তাকে প্রস্রাব করতে বাধা দিয়ো না, তাকে ছাড়ো। পরে রাসুলুল্লাহ (সা.) লোকটিকে কাছে ডাকলেন এবং সুন্দর করে বুঝিয়ে বললেন, মসজিদ আল্লাহর ঘর; এটা প্রস্রাব করার বা নোংরা করার জায়গা নয়। বরং এটা আল্লাহর জিকির, নামাজ ও কোরআন তেলাওয়াতের স্থান।’ (সহিহ মুসলিম: ৬৮৭)

লোকটি নবী কারিম (স.)-এর এমন অমায়িক আচরণের প্রকৃত মর্ম অনুধাবন করতে পেরেছিলেন। অন্যরা যেখানে তাকে ধমক দিয়ে থামাতে চেয়েছিলেন, সেখানে রাসুলুল্লাহ (স.)-এর মার্জিত উপদেশ তাকে এতটাই মুগ্ধ করেছিল যে, হাদিসে এসেছে পরে লোকটি তার ভুল অনুধাবন করে বলেছিলেন, ‘আমার পিতামাতা তার জন্য উৎসর্গ হোক। তিনি আমাকে ধমকও দিলেন না, গালমন্দও করলেন না।’

ছোট্ট জীবনে আসলে মানুষের সঙ্গে উত্তম আচরণ করাই সমীচীন। এটি মানুষের কাছে মানুষের অধিকার। আর এ সম্পর্কে পবিত্র কোরআনে বলা হয়েছে, ‘তোমরা আল্লাহ ছাড়া কারও উপাসনা করবে না। পিতা মাতা, আত্মীয় স্বজন, এতিম ও দরিদ্রদের সঙ্গে সদ্ব্যবহার তথা সুন্দর আচরণ করবে এবং মানুষের সঙ্গে সুন্দর কথা বলবে।’ (সুরা বাকারা: ৮৩)

আমাদের উচিত পবিত্র মাহে রমজানে মহান আল্লাহর সন্তুষ্টির আশায় আত্মীয়স্বজনের সঙ্গে সুসম্পর্ক রাখা। তাদের কোনো অভাব অনটন আছে কি না সেই খোঁজ রাখা। বিপদে তাদের পাশে দাঁড়ানো। হয়ত এর ওসিলায় মহান আল্লাহ আমাদের জীবনের সব পাপ ক্ষমা করে দেবেন। রাসুলুল্লাহ (স.) বলেছেন, যে ব্যক্তি আল্লাহকে ও শেষ দিনে বিশ্বাস রাখে, সে যেন তার রক্তের সম্পর্ক বজায় রাখে। (বুখারি: ৬১৩৮)

অন্যদিকে, নামাজ-রোজা পালন করেও একজন খারাপ আচরণকারীর ঠিকানা হতে পারে জাহান্নাম। একবার রাসুলুল্লাহ (স.)-এর সামনে দুজন মহিলার কথা আলোচনা করা হলো। তাদের একজন রাতভর ইবাদত করেন এবং দিনে রোজা রাখেন, কিন্তু প্রতিবেশীকে কষ্ট দেন। বিশ্বনবী (স.) বললেন, সে জাহান্নামে যাবে। অপরজন বেশি নফল নামাজ পড়েন না, বেশি নফল রোজাও রাখেন না। শুধু দ্বীনের ফরজ-ওয়াজিবগুলো আদায় করেন। কিন্তু তিনি প্রতিবেশীকে কষ্ট দেন না। রাসুলুল্লাহ (স.) বললেন, সে জান্নাতে যাবে।

কেয়ামতের দিন খুব ভারী ও মর্যাদাপূর্ণ আমল হবে সুন্দর আচরণ। হজরত আবু দারদা (রা.) বর্ণনা করেন, ‘রাসুলুল্লাহ (স.) বলেছেন- مَا مِنْ شَيْءٍ يُوضَعُ فِي الْمِيزَانِ أَثْقَلُ مِنْ حُسْنِ الْخُلُقِ وَإِنَّ صَاحِبَ حُسْنِ الْخُلُقِ لَيَبْلُغُ بِهِ دَرَجَةَ صَاحِبِ الصَّوْمِ وَالصَّلَاةِ ‘কেয়ামতে দিন বান্দার সবচেয়ে ভারী ও মূল্যবান কর্ম হবে সুন্দর আচরণ। (শুধু তা-ই নয়) নিশ্চয়ই সুন্দর আচরণের অধিকারী মানুষ শুধু তার সুন্দর ব্যবহারের বিনিময়েই (নফল) নামাজ ও রোজা পালন করার সাওয়াব অর্জন করবে।’ (তিরমিজি, মাজমাউজ জাওয়ায়েদ)

রাসুল (স.) সবার সঙ্গে অত্যন্ত কোমল আচরণের নির্দেশ দিয়েছেন। আয়েশা (রা.) থেকে বর্ণিত হাদিসে রাসুল (স.) বলেন, ‘আল্লাহ কোমলতা পছন্দ করেন। আল্লাহ কোমলতার বদলা হিসেবে যা দেন, কঠোরতার কারণে তা দেন না।’ (বুখারি: ২৫৯৩)
আরও পড়ুন: রমজানে সৌভাগ্যের অধিকারী হবেন যেভাবে

অপরের কল্যাণ প্রত্যাশা একজন মুসলিমের অন্যতম গুণ। পরামর্শ, উপদেশ, নির্দেশনাসহ অসংখ্য উপায়ে মানবসমাজের সব সদস্যের কল্যাণ কামনা করা যায়। আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত হাদিসে রাসুল (স.) বলেন, ‘একজন মুসলিমের ওপর অন্য মুসলিমের ছয়টি অধিকার আছে।’ তখন বলা হলো, হে আল্লাহর রাসুল, তা কী? তিনি বলেন, ‘মুসলিমের সঙ্গে তোমার দেখা হলে সালাম দেবে। তোমাকে ডাকলে সাড়া দেবে। তোমার কাছে পরামর্শ চাইলে উত্তম পরামর্শ দেবে। হাঁচি দিয়ে ‘আলহামদুলিল্লাহ’ বললে তুমি তার উত্তরে ‘ইয়ারহামুকাল্লাহ’ বলবে। অসুস্থ হলে তাকে দেখতে যাবে। আর মারা গেলে তার জানাজায় অংশগ্রহণ করবে।’ (মুসলিম: ২১৬২)

রাসুলুল্লাহ (স.) বলেছেন, ‘মুমিন ওই ব্যক্তি যে অন্যদের ভালোবাসে এবং অন্যরাও তাকে ভালোবাসে। যে ব্যক্তি অন্যদের ভালোবাসে না এবং অন্যরাও তাকে ভালোবাসে না তার মধ্যে কোনো কল্যাণ নেই।’ (জামে)

প্রিয়নবী (স.) সবসময় সুন্দর আচরণ করতেন। কখনও রূঢ় হতেন না। আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘আল্লাহর রহমতে আপনি তাদের জন্য কোমল হৃদয় হয়েছেন, যদি রূঢ় ও কঠিন হৃদয় হতেন, তাহলে তারা আপনার কাছ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যেত। কাজেই আপনি তাদের ক্ষমা করে দিন এবং তাদের জন্যে মাগফেরাত কামনা করুন।’ (সূরা আলে ইমরান: ১৫৯)
কোরআনুল কারিমে আরো ইরশাদ হয়েছে, ‘তোমরা তোমাদের পিতা-মাতা, নিকটাত্মীয়, এতিম, দরিদ্র, প্রতিবেশী, সঙ্গী-সাথী, পথিক এবং যারা তোমাদের অধিকারে এসেছে, সবার সঙ্গে সুন্দর আচরণ করো।’ (সুরা আন নিসা:৩৬)

হাদিসে এসেছে, ‘যে ব্যক্তি সুন্দর আচরণ থেকে বঞ্চিত সে কল্যাণ থেকেও সম্পূর্ণরূপে বঞ্চিত।’ (সহিহ মুসলিম) আল্লাহ তাআলা মুসলিম উম্মাহকে পবিত্র রমজানে পরস্পরের সঙ্গে সুন্দর ও উত্তম আচরণ করার তাওফিক দান করুন। কোরআন ও সুন্নাহর ওপর যথাযথ আমল করার তাওফিক দান করুন। প্রিয়নবীর প্রিয়পাত্র হিসেবে নিজেদেরে গড়ে তোলার তাওফিক দান করুন। আমিন।

 

 

আরপি/এসআর-০৬


বিষয়: রমজান


আপনার মূল্যবান মতামত দিন:

Top